১৭ সেপ, ২০২৬

শুধু মৃত্যুকালীন ঘোষণার ওপর নির্ভর করে কি দণ্ড প্রদান করা যায়? আইন, নীতি ও গুরুত্বপূর্ণ নজির

ছবি: ফাইল 
কোনো ব্যক্তি মৃত্যুর আগে তার মৃত্যুর কারণ বা মৃত্যুর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পরিস্থিতি সম্পর্কে যে বক্তব্য দেন, আইনগতভাবে তা মৃত্যুকালীন ঘোষণা (Dying Declaration) হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশের সাক্ষ্য আইনে ধরনের বক্তব্যের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২-এর ৩২() ধারায় মৃত্যুকালীন ঘোষণাকে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে প্রাসঙ্গিক গ্রহণযোগ্য প্রমাণ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

আইনে মৃত্যুকালীন ঘোষণা কী?

সাক্ষ্য আইনের ৩২() ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি তার মৃত্যুর কারণ অথবা যে ঘটনার ফলে তার মৃত্যু হয়েছে, সেই ঘটনার কোনো পরিস্থিতি সম্পর্কে বক্তব্য দিলে এবং পরবর্তীতে ওই ব্যক্তির মৃত্যুর কারণ আদালতে প্রশ্নের বিষয় হলে, সেই বক্তব্য প্রাসঙ্গিক হতে পারে।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বক্তব্য দেওয়ার সময় ওই ব্যক্তি অবশ্যই মৃত্যুর আশঙ্কায় থাকতে হবেএমন কোনো শর্ত বাংলাদেশের আইনে নেই।

ধরনের বক্তব্য মৌখিক বা লিখিত হতে পারে। পরিস্থিতিভেদে ইশারা বা অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমেও তা প্রকাশ করা সম্ভব। ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ কর্মকর্তা, চিকিৎসক কিংবা অন্য কোনো ব্যক্তির কাছে দেওয়া বক্তব্যও নির্দিষ্ট শর্তে বিবেচিত হতে পারে। তবে বক্তব্য কী পরিস্থিতিতে, কার মাধ্যমে এবং কীভাবে রেকর্ড করা হয়েছেএসব বিষয় আদালত প্রমাণের গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারণের সময় বিবেচনা করেন।

শর্তাবলিঃ

সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২-এর ৩২() ধারা অনুযায়ী মৃত্যুকালীন জবানবন্দি (Dying Declaration)- মূল উপাদান বা শর্তগুলো হলো- ১. যে ব্যক্তি বিবৃতি দিয়েছেন, তাকে অবশ্যই মারা যেতে হবে। ২. বিবৃতিটি অবশ্যই মৃত্যুর কারণ বা পারিপার্শ্বিক অবস্থা সম্পর্কিত হতে হবে। ৩. কার্যকারণ সম্পর্ক: মৃত্যুর কারণ এবং ঘটনার মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক থাকতে হবে। ৪. মামলাটি যখন ব্যক্তির মৃত্যুর কারণ বা পারিপার্শ্বিকতা নিয়ে হয়, তখন এই বিবৃতিটি প্রাসঙ্গিক আইনিভাবে গ্রহণযোগ্য সাক্ষ্য হিসেবে বিবেচিত হয়।

সাক্ষ্য আইনের সাধারণ নিয়মের ব্যতিক্রম:

সাধারণভাবে শ্রুত সাক্ষ্য (Hearsay Evidence) আদালতে গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ, যে ব্যক্তি মূল বক্তব্য দিয়েছেন, তাকে আদালতে এনে জেরা করার সুযোগ থাকে না। তবে মৃত্যুকালীন ঘোষণা এই সাধারণ নিয়মের একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনগত ব্যতিক্রম (Statutory Exception) এক্ষেত্রে প্রচলিত নীতির সঙ্গে Nemo moriturus praesumitur mentireঅর্থাৎ মৃত্যুপথযাত্রী ব্যক্তি মিথ্যা বলবেন নাএই ধারণাটি যুক্ত করা হয়। বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত Milon @ Shahabuddin Ahmed v. State, 53 DLR 464 মামলায় মৃত্যুকালীন ঘোষণার প্রমাণের গ্রহণযোগ্যতা নির্ভরযোগ্যতার নীতি আলোচিত হয়েছে। এ মামলায় আদালত বলেন, মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে থাকা একজন ব্যক্তি সাধারণত নির্দোষ কাউকে মিথ্যাভাবে জড়াবেন না, এমনকি ওই ব্যক্তির সঙ্গে তার শত্রুতাও থাকলেও।

মৃত্যুর আশঙ্কা থাকা বাধ্যতামূলক নয়:

ইংরেজি প্রচলিত আইনের তুলনায় বাংলাদেশের আইনে মৃত্যুকালীন ঘোষণার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। সাক্ষ্য আইনের ৩২() ধারাই স্পষ্ট করে যে, বক্তব্য দেওয়ার সময় ওই ব্যক্তি মৃত্যুর প্রত্যাশায় ছিলেন কি না, তা বক্তব্যটির প্রাসঙ্গিকতার জন্য অপরিহার্য নয়। Humayun Matubbar v. State, 51 DLR 433 মামলায়ও বলা হয়েছে, মৃত্যুকালীন ঘোষণা দেওয়ার সময় ঘোষণাকারীকে তাৎক্ষণিক মৃত্যুর প্রত্যাশায় থাকা আবশ্যক নয়। একই সঙ্গে এর প্রাসঙ্গিকতা শুধু হত্যাজনিত মৃত্যুর ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়।

শুধু মৃত্যুকালীন ঘোষণার ভিত্তিতে কি দণ্ড হতে পারে?

হ্যাঁ, নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে পারে। কোনো মৃত্যুকালীন ঘোষণা যদি আদালতের কাছে সত্য, স্বেচ্ছাপ্রণোদিত নির্ভরযোগ্য (truthful, voluntary and reliable) বলে প্রতীয়মান হয়, তাহলে স্বাধীনভাবে অন্য প্রমাণ দিয়ে তার সমর্থন করা সবসময় বাধ্যতামূলক নয়। এমনকি উপযুক্ত ক্ষেত্রে শুধু একটি নির্ভরযোগ্য মৃত্যুকালীন ঘোষণাই দণ্ডের ভিত্তি হতে পারে।

ভারতের সুপ্রিম কোর্টের Khushal Rao v. State of Bombay, AIR 1958 SC 22 মামলায় বলা হয়েছে, নির্ভরযোগ্য মৃত্যুকালীন ঘোষণা একাই দণ্ডের পর্যাপ্ত ভিত্তি হতে পারে এবং প্রতিটি ক্ষেত্রে স্বাধীন সমর্থন বা corroboration বাধ্যতামূলক নয়।

বাংলাদেশেও একই ধরনের নীতি দেখা যায়। State v. Kabel Molla and others, 55 DLR 108 মামলায় একটি যথাযথভাবে রেকর্ড করা বিশ্বাসযোগ্য মৃত্যুকালীন ঘোষণা আসামির দণ্ডের পর্যাপ্ত ভিত্তি হতে পারে বলে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

তবে সন্দেহযুক্ত ঘোষণা গ্রহনযগ্য নয়:

মৃত্যুকালীন ঘোষণা থাকলেই আদালত তা অন্ধভাবে গ্রহণ করবেনএমন নয়। আদালতকে বক্তব্যটির সত্যতা, স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হওয়ার বিষয়, সামঞ্জস্য এবং পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি সতর্কতার সঙ্গে বিচার করতে হয়।

State v. Babul Hossain, 52 DLR 400 মামলায় বলা হয়েছে, মৃত্যুকালীন ঘোষণার সত্যতা বা নির্ভুলতা নিয়ে সন্দেহ থাকলে শুধু সেই বক্তব্যের ওপর নিরাপদে নির্ভর করে দণ্ড দেওয়া যায় না। দণ্ডের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করার আগে আদালতকে বক্তব্যটির নির্ভরযোগ্যতা সম্পর্কে সন্তুষ্ট হতে হবে এবং তা প্ররোচিত বা শেখানো হয়েছে কি না, সেটিও বিবেচনা করতে হবে।

একইভাবে, হুমকি, জবরদস্তি, প্ররোচনা বা প্রতারণার মাধ্যমে বক্তব্য আদায় করা হলে তার ওপর নির্ভর করা নিরাপদ নয়। Sonali Bank v. Hare Krishna Das, 49 DLR 282 মামলায় ধরনের বক্তব্যের গ্রহণযোগ্যতা নির্ভরযোগ্যতার বিষয়টি বিবেচনা করা হয়েছে।

এসব বিষয় বিবেচনা করেই আদালত এর প্রমাণের গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারণ করে।

পরিশেষে, সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২-এর ৩২(১) ধারার অধীনে একটি সত্য, স্বেচ্ছাপ্রণোদিত ও নির্ভরযোগ্য মৃত্যুকালীন ঘোষণা উপযুক্ত ক্ষেত্রে স্বাধীন সমর্থন ছাড়াও দণ্ডের একমাত্র ভিত্তি হতে পারে।তবে বক্তব্যটি সন্দেহযুক্ত, অসত্য, প্ররোচিত, জবরদস্তিমূলক বা প্রতারণার মাধ্যমে নেওয়া প্রমাণিত হলে আদালত শুধু তার ওপর নির্ভর করে দণ্ড দিতে পারেন না।

তথ্যসূত্র: The Evidence Act, 1872, Section 32(1); Milon @ Shahabuddin Ahmed v. State, 53 DLR 464; Humayun Matubbar v. State, 51 DLR 433; State v. Kabel Molla and others, 55 DLR 108; State v. Babul Hossain, 52 DLR 400; Sonali Bank v. Hare Krishna Das, 49 DLR 282; Khushal Rao v. State of Bombay, AIR 1958 SC 22.

 

বিডিএলপিবি/মাসুম


শেয়ার করুন

0 coment rios: