![]() |
| ছবি: সংগৃহীত |
২০২৬ সালের ৩০ জুলাই বিচারপতি মো. আলী রেজার একক বেঞ্চ দিন ইসলাম সিকদার বনাম আফরোজা বেগম ও অন্যান্য (সিভিল রিভিশন নং ৬৬১/২০২৫) মামলায় এ রায় দেন। ঢাকার একটি সম্পত্তিসংক্রান্ত বিরোধে দায়ের করা এই সিভিল রিভিশনের রুল খারিজ করে দেন আদালত।
মামলার পটভূমি:
মামলার নথি অনুযায়ী, আবদুর রহমান ১৯৫৫ সালে একটি নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে বিতর্কিত সম্পত্তিটি ক্রয় করেন। পরবর্তীতে ১৯৮৭ সালে তিনি সাইফুজ্জামানকে সম্পত্তিটি ভাড়া দেন। ভাড়া বকেয়া থাকায় ১৯৯৭ সালে আবদুর রহমান উচ্ছেদ ও বকেয়া ভাড়া আদায়ের মামলা করেন। অন্যদিকে, সাইফুজ্জামান সম্পত্তির সুনির্দিষ্ট কার্যসম্পাদনের দাবিতে মামলা দায়ের করেন। উভয় মামলা একসঙ্গে শুনানি শেষে উচ্ছেদের মামলাটি ডিক্রি হয় এবং সুনির্দিষ্ট কার্যসম্পাদনের মামলাটি খারিজ হয়।
পরবর্তীতে সাইফুজ্জামান ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রিভিশন ও লিভ পিটিশন দায়ের করলেও সেগুলো খারিজ হয়ে যায়।
এদিকে, সম্পত্তিটি আইএফআইসি ব্যাংকে বন্ধক রেখে ঋণ গ্রহণ এবং পরবর্তী নিলাম কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে নতুন বিরোধের সৃষ্টি হয়। আবদুর রহমান একতরফা ডিক্রি বাতিলের আবেদন করলে তা মঞ্জুর হয়। পরবর্তী ঋণসংক্রান্ত মামলায় হাইকোর্ট বিভাগ ২০০৮ সালে আবদুর রহমানের ওপর ঋণের দায় আরোপের সিদ্ধান্ত বাতিল করেন। ২০১২ সালে আপিল বিভাগও লিভ পিটিশন খারিজ করে ওই সিদ্ধান্ত বহাল রাখেন।
এরপর বর্তমান বাদী সম্পত্তিসংক্রান্ত একটি মামলা দায়ের করেন, যা পরবর্তীতে টাইটেল স্যুট নং ১৭/২০২৩ হিসেবে নম্বরায়িত হয়। বিবাদীপক্ষ দেওয়ানি কার্যবিধির Order VII Rule 11 এবং ১১ ও ১৫১ ধারায় আরজি খারিজের আবেদন করলে বিচারিক আদালত ২০২৩ সালের ৭ মার্চ তা মঞ্জুর করেন। পরে ২০২৫ সালের ৯ জানুয়ারি আপিল আদালতও ওই সিদ্ধান্ত বহাল রাখেন। এর বিরুদ্ধে বাদী হাইকোর্ট বিভাগে সিভিল রিভিশন নং ৬৬১/২০২৫ দায়ের করেন।
আদালতের পর্যবেক্ষণ:
১. প্রতারণা অনুমাননির্ভর নয়, প্রমাণসাপেক্ষ: হাইকোর্ট বিভাগ পর্যবেক্ষণ দেন, প্রতারণার অভিযোগ কেবল অনুমানের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠা করা যায় না। এ ধরনের অভিযোগ সুনির্দিষ্টভাবে উত্থাপন করতে হবে এবং সুস্পষ্ট, নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য সাক্ষ্যপ্রমাণের মাধ্যমে তা প্রমাণ করতে হবে।
আদালতের মতে, কোনো অভিযোগ বা বিরোধ সম্পর্কে আগে থেকে জানা থাকাই আইনগতভাবে প্রতারণা প্রমাণের জন্য যথেষ্ট নয়। বরং আদালত বা অন্য কাউকে বিভ্রান্ত করে বেআইনি সুবিধা অর্জনের উদ্দেশ্যে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ইচ্ছাকৃতভাবে গোপন করা বা ভুলভাবে উপস্থাপনের বিষয়টি প্রমাণিত হতে হবে।
২. পূর্ববর্তী কার্যক্রমে প্রতারণার অভিযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়নি: বাদীপক্ষ ১৯৯২ সালের একটি আইনি নোটিশ ও চিঠির অনুলিপি উপস্থাপন করে দাবি করেন, আবদুর রহমান বন্ধকসংক্রান্ত অভিযোগ সম্পর্কে আগে থেকেই অবগত ছিলেন। তবে হাইকোর্ট বিভাগ লক্ষ করেন, পূর্ববর্তী ঋণসংক্রান্ত কার্যক্রমে এ ধরনের প্রতারণার অভিযোগ উত্থাপিত বা বিচারিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। আদালতের পর্যবেক্ষণ, পরবর্তী পর্যায়ে উত্থাপিত অভিযোগের ভিত্তিতে পূর্ববর্তী কার্যক্রমকে প্রতারণাজনিত বলে অকার্যকর ঘোষণা করার মতো পর্যাপ্ত ভিত্তি নেই।
৩. চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি হওয়া বিরোধ পুনরায় উত্থাপন করা যাবে না: আদালত বলেন, দেশের সর্বোচ্চ আদালতে কোনো বিষয় চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি হলে মামলার চূড়ান্ততার নীতি অনুসারে তা পুনরায় উত্থাপনের সুযোগ সীমিত। আইনস্বীকৃত পদ্ধতি অনুসরণ না করে নতুন বা পার্শ্ববর্তী মামলা দায়েরের মাধ্যমে সেই সিদ্ধান্তকে পুনরায় প্রশ্নবিদ্ধ করা যায় না। এ প্রসঙ্গে আদালত Abdul Jalil বনাম Islami Bank Bangladesh Limited, 7 MLR (AD) 258 মামলার নজির উল্লেখ করেন।
৪. নিম্ন আদালতের সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপের অবকাশ নেই: হাইকোর্ট বিভাগ মনে করেন, নিম্ন আদালতগুলো প্রাসঙ্গিক নথিপত্র, পূর্ববর্তী রায় এবং উচ্চতর আদালতের সিদ্ধান্তের বাধ্যতামূলক প্রভাব যথাযথভাবে বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন।
আদালতের মতে, নিম্ন আদালতের সিদ্ধান্তে এমন কোনো আইনগত ত্রুটি বা বিচারিক অসংগতি নেই, যা সংশোধনের জন্য রিভিশন আদালতের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।
আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত:
মামলার সার্বিক ঘটনা, নথিপত্র ও আইনগত দিক বিবেচনায় নিয়ে হাইকোর্ট বিভাগ সিভিল রিভিশন নং ৬৬১/২০২৫-এর রুল খারিজ করেন। একই সঙ্গে মামলায় কোনো স্থগিতাদেশ বা স্থিতাবস্থার আদেশ থাকলে তা প্রত্যাহারের নির্দেশ দেন।
আইনি শিক্ষা:
এই রায়ে আদালত মামলার চূড়ান্ততা, প্রতারণার অভিযোগ প্রমাণের দায় এবং পূর্বনিষ্পন্ন বিরোধ পুনরায় উত্থাপনের সীমা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন। কোনো বিরোধে পূর্বজ্ঞান থাকাই প্রতারণার প্রমাণ নয়; আবার সর্বোচ্চ আদালতে চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি হওয়া বিষয় নতুন মামলার মাধ্যমে পুনরায় উত্থাপনের ক্ষেত্রেও আইনগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
সূত্র: Civil Revision No. 661 of 2025, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট বিভাগ। রায়ের তারিখ: ৩০ জুলাই ২০২৬। লিখিত রায় পাবলিশ করা হয় ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে।
বিডিএলপিবি/মাসুম

0 coment rios: