২৯ সেপ, ২০২৬

বিকল্প আইনি প্রতিকার থাকলে অর্থঋণ মামলায় সরাসরি রিট নয়: হাইকোর্ট

আগের তিন রিটের তথ্য গোপন করে মামলা করায় আইনজীবীকে ১০ হাজার টাকা খরচ প্রদানের আদেশ 
অর্থঋণ আদালতের রায় ও ডিক্রির বিরুদ্ধে বিকল্প কার্যকর আইনি প্রতিকার থাকা সত্ত্বেও সরাসরি সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে রিট আবেদন করা যাবে না বলে রুল খারিজ করেছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে আগের তিনটি রিট মামলা এবং সংশ্লিষ্ট আপিলের তথ্য গোপন করে বর্তমান রিট দায়েরের বিষয়টি আদালতের কাছে প্রমাণিত হওয়ায় আবেদনকারী পক্ষের আইনজীবীকে ১০ হাজার টাকা খরচ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বিচারপতি মো. মোজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি রেজাউল করিমের হাইকোর্ট বেঞ্চ ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ এ রায় দেন। আদালতে মামলাটি শুনানি হয় ২০ আগস্ট ও ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬। সম্প্রতি রায়ের লিখিত অনুলিপি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়। মামলাটি হলো রিট পিটিশন নং- ৫২৩৮/২০২৫, মেসার্স মৌসুমি ট্রেডার্স বনাম অর্থঋণ আদালত-১, ঢাকার বিচারক ও অন্যান্য।

মামলার পটভূমি:

একটি ব্যাংক অর্থঋণ আদালতে ২৫ কোটি ৬৩ লাখ ৮০ হাজার ৬৭১ টাকা ৭০ পয়সা পাওনা দাবি করে মামলা করে। পরে মামলাটি একতরফাভাবে ডিক্রি হয়। ডিক্রির ভিত্তিতে ব্যাংক ২৭ কোটি ১৬ লাখ ১৩ হাজার ৫২৩ টাকা ১৬ পয়সা আদায়ের দাবিতে অর্থজারি মামলা দায়ের করে।

রিট আবেদনকারীরা ছিলেন অর্থঋণ মামলা নং ৮২/২০২০-এর বিবাদী এবং অর্থ জারি মামলা নং ১২৫/২০২১-এর ডিক্রিদার। তারা অর্থঋণ আদালতের একতরফা রায় ও ডিক্রি এবং পরবর্তী জারি কার্যক্রমকে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করেন।

রিটকারীদের অভিযোগ ছিল, অর্থঋণ মামলায় তাদের যথাযথভাবে সমন জারি করা হয়নি। এ ছাড়া বন্ধক রাখা সম্পত্তি ডিক্রি ও পরবর্তী জারি কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়েও তারা আপত্তি জানান।

ব্যাংকের বক্তব্য:

ব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হয়, রিটকারীদের জন্য অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩-এর ১৯ ও ৪১ ধারায় কার্যকর বিকল্প প্রতিকার রয়েছে। ফলে ওই প্রতিকার গ্রহণ না করে সরাসরি সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে রিট করা আইনত গ্রহণযোগ্য নয়।

ব্যাংক আরও জানায়, রিটকারীরা এর আগে একই বিরোধকে কেন্দ্র করে আরও তিনটি রিট মামলা করেছিলেন। এর মধ্যে একটি রিট খারিজ হয়েছিল, একটি মামলা অনুপস্থিতির কারণে খারিজ হয় এবং আরেকটি রিটও অনুপস্থিতির কারণে খারিজ হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে তারা আপিল বিভাগেও সিপি ফর লিভ টু আপিল দায়ের করেছিলেন।

আগের মামলার তথ্য গোপনের অভিযোগ:

আদালত দেখতে পান, আগের রিট ও আপিলের বিষয়গুলো বর্তমান রিট আবেদনে উল্লেখ করা হয়নি। এমনকি আগের রিটগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীই আদালতে উপস্থিত ছিলেন—এ বিষয়টিও আদালতের নজরে আসে।

হাইকোর্ট বলেন, আগের মামলাগুলো থেকে রিটকারীদের অর্থঋণ আদালতের রায় ও ডিক্রি সম্পর্কে জ্ঞান ছিল। সে ক্ষেত্রে তাদের অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩-এর ১৯ ধারার প্রতিকার গ্রহণ করা উচিত ছিল।

সমন জারির বিষয়ে আদালতের পর্যবেক্ষণ:

রিটকারীদের দাবি ছিল, অর্থঋণ মামলায় যথাযথভাবে সমন জারি হয়নি। তবে হাইকোর্ট মামলার নথি পর্যালোচনা করে দেখতে পান, প্রথমে সাধারণ পদ্ধতিতে ও রেজিস্টার্ড ডাকযোগে সমন পাঠানো হয়েছিল। তা জারি না হওয়ায় পরে আদালতের নির্দেশে দৈনিক সংবাদপত্রে সমন প্রকাশ করা হয়।

আদালত আরও দেখতে পান, সমন জারির পর পর্যাপ্ত সময় পার হয়েছিল এবং অর্থঋণ আদালতের বিচারকও আইন অনুযায়ী সমন যথাযথভাবে জারি হয়েছে বলে উল্লেখ করেছিলেন। ফলে একতরফা রায় দেওয়ার ক্ষেত্রে আদালতের কোনো বেআইনি কার্যক্রম পাওয়া যায়নি।

বন্ধকী সম্পত্তি জারি মামলায় অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে সিদ্ধান্ত:

রিটকারীরা দাবি করেছিলেন, ব্যাংকের কাছে বন্ধক রাখা সম্পত্তি অর্থঋণ মামলার ডিক্রি ও পরবর্তী জারি কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা বেআইনি।

হাইকোর্ট অর্থঋণ আদালত আইনের ৮(২)(খ) ধারা পর্যালোচনা করে বলেন, ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে মামলা দায়েরের সময় বন্ধক রাখা স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির বিস্তারিত বিবরণ দিতে হয়। ফলে ডিক্রি বাস্তবায়নের জন্য ওই বন্ধকী সম্পত্তি জারি মামলার তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রে আইনগত বাধা নেই।

বিকল্প প্রতিকার থাকলে রিটের সীমা:

হাইকোর্টের রায়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—অর্থঋণ আদালতের রায় বা ডিক্রির বিরুদ্ধে আইনেই যখন কার্যকর বিকল্প প্রতিকারের ব্যবস্থা রয়েছে, তখন সরাসরি রিটের মাধ্যমে সেই প্রতিকার গ্রহণের সুযোগ নেই।

আদালত অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩-এর ৫(২), ৫(৩), ৫(৮) ও ৫(১১) ধারার বিধান পর্যালোচনা করেন। আদালত বলেন, অর্থঋণ আদালত একটি বিশেষ আইন দ্বারা পরিচালিত আদালত এবং ওই আইনের সঙ্গে অসঙ্গতি না থাকলে দেওয়ানি কার্যবিধির বিধান প্রযোজ্য হবে।

আগের তথ্য গোপন করাকে গুরুতর হিসেবে দেখলেন আদালত:

হাইকোর্ট আরও বলেন, বর্তমান রিট দায়েরের আগে একই পক্ষ তিনটি রিট করেছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে আপিল বিভাগেও গিয়েছিলেন। এসব তথ্য বর্তমান রিটে গোপন করা হয়েছে।

আদালতের পর্যবেক্ষণ, আগের রিটগুলোর সবগুলোতেই একই আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন। ফলে আগের মামলার তথ্য গোপনের বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে। আদালতের মতে, এর মাধ্যমে অর্থ জারি কার্যক্রম থামিয়ে ডিক্রির টাকা আদায়ের প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করার চেষ্টা করা হয়েছিল।

রুল খারিজ, ১০ হাজার টাকা খরচ:

সবশেষে হাইকোর্ট রুল খারিজ করেন। একই সঙ্গে আবেদনকারী পক্ষের আইনজীবীকে ১০ হাজার টাকা টোকেন খরচ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। এই অর্থ ১৫ দিনের মধ্যে হাইকোর্ট বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখায় জমা দিতে বলা হয়েছে।

রুল জারির সময় অর্থ জারি মামলার কার্যক্রমের ওপর যে স্থগিতাদেশ দেওয়া হয়েছিল, সেটিও প্রত্যাহার ও বাতিল করা হয়েছে। রায়ের অনুলিপি সংশ্লিষ্ট আদালতে দ্রুত পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।

আইনি শিক্ষা

১. বিকল্প কার্যকর প্রতিকার থাকলে সরাসরি রিট নয়:
কোনো বিশেষ আইনে কার্যকর প্রতিকারের ব্যবস্থা থাকলে সাধারণভাবে সেই প্রতিকার গ্রহণ করতে হয়।

২. অর্থঋণ আদালত আইন একটি বিশেষ আইন:
অর্থঋণ সংক্রান্ত বিরোধে বিশেষ আইনের বিধান প্রাধান্য পাবে; দেওয়ানি কার্যবিধি প্রযোজ্য হলেও তা ওই বিশেষ আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রয়োগ করতে হবে।

৩. বন্ধকী সম্পত্তি জারি মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে:
আইনের নির্ধারিত বিধান অনুযায়ী বন্ধক রাখা সম্পত্তি ডিক্রি বাস্তবায়নের জন্য জারি মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা আইনসম্মত হতে পারে।

৪. আগের মামলা গোপন করা গুরুতর বিষয়:
একই বিরোধ নিয়ে আগে করা মামলা ও আপিলের তথ্য গোপন করে নতুন রিট করলে আদালত বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে পারেন।

৫. রিট আপিলের বিকল্প নয়:
আইনে নির্ধারিত কার্যকর প্রতিকারকে পাশ কাটিয়ে রিটের মাধ্যমে একই বিষয়ে বিচারিক পর্যালোচনা চাওয়া সব ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য নয়।

রায়ের মূল বক্তব্য:

অর্থঋণ আদালতের রায় ও ডিক্রির বিরুদ্ধে অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩-এ কার্যকর বিকল্প প্রতিকার থাকলে সেই প্রতিকার গ্রহণ না করে সরাসরি সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে রিট করা যাবে না। একই সঙ্গে আগের মামলা ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করে রিট করলে তা আদালতের প্রতিকার পাওয়ার ক্ষেত্রে গুরুতর প্রতিবন্ধক হতে পারে।


বিডিএলপিবি/মাসুম


শেয়ার করুন

0 coment rios: