চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে কুষ্টিয়ায় সংঘটিত বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দায়েরকৃত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আইনি প্রক্রিয়ার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধাপ শুরু হতে যাচ্ছে। কুষ্টিয়ায় পৃথক ঘটনায় ছয়জনকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফসহ মোট চারজন উচ্চপদস্থ নেতার পক্ষে আজ আদালতে চূড়ান্ত যুক্তিতর্ক বা আর্গুমেন্ট উপস্থাপন করা হবে।
মঙ্গলবার (৯ জুন) ঢাকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন অত্যন্ত হেভিওয়েট ও শক্তিশালী তিন সদস্যবিশিষ্ট বিচারিক প্যানেলে এই চাঞ্চল্যকর মামলার যুক্তি উপস্থাপন করবে আসামিপক্ষ। সাবেক ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষস্থানীয় ও জেলা পর্যায়ের নেতাদের এই স্পর্শকাতর মামলার বিচার প্রক্রিয়াকে ঘিরে আইনজীবী, গণমাধ্যম এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল ও আগ্রহের সৃষ্টি হয়েছে।
এই মামলায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা মাহবুব-উল আলম হানিফ ছাড়া অভিযুক্ত অন্য তিন প্রভাবশালী আসামি হলেন যথাক্রমে—কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের বর্তমান সভাপতি সদর উদ্দিন খান, দলটির জেলা সাধারণ সম্পাদক আজগর আলী এবং কুষ্টিয়া শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান আতা। মামলার নথিসূত্রে জানা গেছে, অভিযুক্ত এই চারজন হেভিওয়েট আসামির প্রত্যেকেই দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে আইনি প্রক্রিয়ো এড়াতে বর্তমানে সম্পূর্ণ পলাতক বা আত্মগোপনে রয়েছেন। তাদের অনুপস্থিতিতেই ট্রাইব্যুনালের সুনির্দিষ্ট আইন অনুযায়ী এই বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
এর আগে, গত ৭ জুন ট্রাইব্যুনালে শুনানি চলাকালীন আসামি মাহবুব-উল আলম হানিফসহ চার আসামির বিরুদ্ধে আনীত সমস্ত অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে বলে দাবি করে তাদের আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ শাস্তি অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ড চেয়ে নিজেদের পক্ষে চূড়ান্ত যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ করে রাষ্ট্রপক্ষ বা প্রসিকিউশন। ওইদিন আদালতের এজলাসে প্রসিকিউশনের পক্ষে অত্যন্ত জোরালোভাবে আইনি যুক্তি ও নথিপত্র তুলে ধরেন জ্যেষ্ঠ প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম। শুনানি চলাকালে আদালতে প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদসহ প্রসিকিউশনের দায়িত্বে থাকা অন্য বেশ কয়েকজন প্রসিকিউটর ও তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। রাষ্ট্রপক্ষ তাদের যুক্তিতর্কে উল্লেখ করেছিল যে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় কুষ্টিয়ায় যে সহিংসতা ও প্রাণহানি ঘটেছিল, তার পেছনে আসামিদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ উসকানি এবং সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক নীল নকশা কাজ করেছে।
আদালতের কার্যবিবরণী থেকে জানা যায়, অত্যন্ত সংবেদনশীল এ মামলায় আইনি যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের মূল পর্ব আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছিল চলতি বছরের ১১ মে। তারও আগে, গত ২৩ এপ্রিল মামলার তদন্ত কর্মকর্তার (আইও) দীর্ঘ জেরা সম্পন্ন হওয়ার মধ্য দিয়ে এই মামলার মোট ১৯ জন সাক্ষীর গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্যগ্রহণ ও জবানবন্দি নেওয়ার দীর্ঘ প্রক্রিয়াটি সফলভাবে সম্পন্ন হয়।
গত বছরের ২ নভেম্বর পলাতক এই চার আসামির বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ আনুষ্ঠানিকভাবে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বা চার্জ গঠনের মাধ্যমে এই মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শুরুর ঐতিহাসিক আদেশ প্রদান করেছিলেন। এর আগে, গত বছরের ৫ অক্টোবর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চার নেতার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র বা ফরমাল চার্জ দাখিল করে প্রসিকিউশন বিভাগ। পরদিন অর্থাৎ ৬ অক্টোবর ট্রাইব্যুনাল সেই অভিযোগপত্রটি যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে আমলে নেয়। পুরো মামলায় এই চার আসামির বিরুদ্ধে মূলত জুলাই গণঅভ্যুত্থান দমনে সাধারণ মানুষের ওপর বলপ্রয়োগের জন্য উসকানিমূলক ও উগ্র বক্তব্য প্রদান, সরকার টিকিয়ে রাখতে গোপনে অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের জাল বোনা এবং কুষ্টিয়ায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে ছয়জন নিরীহ মানুষকে নির্মমভাবে হত্যার হুকুমদাতার অভিযোগ আনা হয়েছে। আজ আসামিপক্ষের আইনজীবীরা এই অভিযোগগুলোর বিরুদ্ধে পাল্টা আইনি যুক্তি উপস্থাপন করবেন।
বিডিএলপিবি/এমএম

0 coment rios: