সুপ্রিম কোর্টের জন্য একটি সম্পূর্ণ পৃথক ও স্বাধীন বিচার বিভাগীয় সচিবালয় গঠন করার নির্দেশ দিয়ে হাইকোর্ট বিভাগ যে রায় দিয়েছিলেন, তা সাময়িকভাবে স্থগিত করেছেন সর্বোচ্চ আদালত আপিল বিভাগ। একইসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের জন্য এই পৃথক স্বাধীন সচিবালয় প্রতিষ্ঠার রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের দায়ের করা আপিল শুনানির জন্য আগামী ১৬ জুন পরবর্তী দিন নির্ধারণ করেছেন আদালত।
প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বেঞ্চ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, এই আপিল মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত হাইকোর্টের দেওয়া পূর্বের রায়টি সম্পূর্ণ স্থগিত থাকবে। মঙ্গলবার সকালে দেশের নবনিযুক্ত প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আপিল বেঞ্চ এই আদেশ দেন। আদালতে আজ রাষ্ট্রপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ আইনি শুনানি পরিচালনা করেন নবনিযুক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল। অন্যদিকে রিটকারীদের পক্ষে আপিল বিভাগে আইনি লড়াইয়ে অংশ নেন সুপ্রিম কোর্টের প্রবীণ আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির।
এর আগে মঙ্গলবার সকালে তিন মাসের মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের জন্য একটি পৃথক স্বাধীন সচিবালয় করার নির্দেশ দিয়ে হাইকোর্টের দেওয়া পূর্ণাঙ্গ রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের করা আপিল আবেদনটির আনুষ্ঠানিক শুনানি শুরু হয়। গত ২১ মে হাইকোর্টের এই ঐতিহাসিক রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আপিল করেছিল রাষ্ট্রপক্ষ। তারও আগে, গত ৭ এপ্রিল দীর্ঘ ১৮৫ পৃষ্ঠার বিস্তারিত ও পূর্ণাঙ্গ হাইকোর্টের রায়টি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়।
মূলত গত বছরের ২ সেপ্টেম্বর বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত একটি হাইকোর্ট বেঞ্চ এই যুগান্তকারী রায়টি ঘোষণা করেছিলেন। রায়ে অধস্তন বা নিম্ন আদালতের দায়িত্ব পালনরত ম্যাজিস্ট্রেটদের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ, যার মধ্যে তাদের কর্মস্থল নির্ধারণ, পদোন্নতিদান এবং ছুটি মঞ্জুরিসহ সব ধরনের শৃঙ্খলা বিধানের দায়িত্ব রাষ্ট্রপতির ওপর ন্যস্ত থাকা সংক্রান্ত বাংলাদেশের সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদের বিশেষ বিধানটি অসাংবিধানিক ও অবৈধ ঘোষণা করে বাতিল করেছিলেন হাইকোর্ট।
হাইকোর্টের ওই রায়ের ফলে অধস্তন আদালতের দায়িত্ব পালনরত ম্যাজিস্ট্রেটদের সামগ্রিক নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা বিধানের পূর্ণাঙ্গ দায়িত্ব সুপ্রিম কোর্টের ওপর ন্যস্ত হয়েছিল। একইসঙ্গে অধস্তন আদালতের বিচারকদের জন্য বিগত ২০১৭ সালে প্রণয়ন করা জুডিসিয়াল সার্ভিস বা শৃঙ্খলাবিধিটি সম্পূর্ণ বাতিল ঘোষণা করা হয়েছিল। হাইকোর্টে মূল রিটকারীদের পক্ষে শুরু থেকেই মামলাটি পরিচালনা করেন আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির। আদালতকে আইনি সহায়তাদানের জন্য অ্যামিকাস কিউরি বা আদালতের বন্ধু হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন সিনিয়র অ্যাডভোকেট শরীফ ভূইঁয়া।
আর রাষ্ট্রপক্ষে তখন মামলাটি পরিচালনা করেছিলেন তৎকালীন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান। ২০২৪ সালের ২৫ আগস্ট সংবিধানের বিতর্কিত ১১৬ অনুচ্ছেদ এবং ২০১৭ সালের জুডিসিয়াল সার্ভিস শৃঙ্খলা বিধিমালার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে এবং বিচার বিভাগীয় পৃথক ও স্বায়ত্তশাসিত সচিবালয় প্রতিষ্ঠার সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা চেয়ে সুপ্রিম কোর্টের সাতজন সচেতন আইনজীবী যৌথভাবে এই জনস্বার্থমূলক রিটটি দায়ের করেছিলেন। পরে একই বছরের ২৭ অক্টোবর হাইকোর্ট এই বিষয়ে বিস্তারিত রুল জারি করেন।
বাংলাদেশের বর্তমান সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বিচার-কর্ম বিভাগে নিযুক্ত ব্যক্তিদের এবং বিচার বিভাগীয় দায়িত্ব পালনরত ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা বিধানের চূড়ান্ত ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির ওপর ন্যস্ত। সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রপতি সাধারণত এই ক্ষমতা প্রয়োগ করে থাকেন। তবে রিটকারীদের আইনজীবীদের মূল যুক্তি হলো, এই অনুচ্ছেদের কারণে রাষ্ট্রপতির ওপর ন্যস্ত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে কার্যত রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগের বা আইন মন্ত্রণালয়ের সরাসরি রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ দেখা যায়, যা বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে মারাত্মকভাবে খর্ব ও ব্যাহত করে। প্রসংগত উল্লেখ্য, দেশের আদি অর্থাৎ ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানে অধস্তন আদালতের ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা বিধানের এই মূল দায়িত্বটি সরাসরি সুপ্রিম কোর্টের ওপরই ন্যস্ত ছিল।
পরবর্তীতে ১৯৭৪ সালে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে এই ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্ট থেকে কেড়ে নিয়ে রাষ্ট্রপতির ওপর ন্যস্ত করা হয়। এরপর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ পঞ্চম সংশোধনী আইনকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করলে, পঞ্চদশ সংশোধনী আইন ২০১১-এর মাধ্যমে ১১৬ অনুচ্ছেদের বর্তমান রূপটি প্রতিস্থাপন করা হয়।
বিডিএলপিবি/এমএম

0 coment rios: