২৪ সেপ, ২০২৬

হাইকোর্টের স্থায়ী বিচারপতি হিসেবে শপথ নিলেন দেবাশীষ রায় চৌধুরী

হাইকোর্টের স্থায়ী বিচারপতি হিসেবে শপথ নিলেন দেবাশীষ রায় চৌধুরী

 

সুপ্রিম কোর্টের জাজেস লাউঞ্জে প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী তাকে শপথ পড়ান

সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের স্থায়ী বিচারপতি হিসেবে শপথ নিয়েছেন বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরী। বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬) সকাল ১১টায় সুপ্রিম কোর্টের জাজেস লাউঞ্জে তাকে শপথবাক্য পাঠ করান প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী। শপথ অনুষ্ঠানে সুপ্রিম কোর্টের আপিল ও হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি এবং সুপ্রিম কোর্ট রেজিস্ট্রির কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

রাষ্ট্রপতির নিয়োগ

এর আগে গত ২১ সেপ্টেম্বর বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীকে হাইকোর্ট বিভাগের স্থায়ী বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেন রাষ্ট্রপতি। আইন ও বিচার বিভাগের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রধান বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শক্রমে হাইকোর্ট বিভাগের অতিরিক্ত বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীকে হাইকোর্ট বিভাগের বিচারক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। শপথ গ্রহণের তারিখ থেকে এ নিয়োগ কার্যকর হবে।

অতিরিক্ত বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ

বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরী ২০২৪ সালের ৮ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের অতিরিক্ত বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান। একই সময়ে নিয়োগ পাওয়া কয়েকজন অতিরিক্ত বিচারপতিকে পরবর্তী সময়ে স্থায়ী করা হলেও তাকে তখন স্থায়ী বিচারপতি করা হয়নি। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সে সময় তার বয়স ৪৫ বছর পূর্ণ না হওয়ায় স্থায়ীকরণ হয়নি। বয়সসংক্রান্ত শর্ত পূরণের পর তাকে স্থায়ী বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

আইন পেশায় অভিজ্ঞতা

বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরী যুক্তরাজ্যে আইন বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। তিনি ইউনিভার্সিটি অব উলভারহ্যাম্পটন থেকে এলএলবি (অনার্স), কলেজ অব ল থেকে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমা এবং হলবর্ন কলেজ থেকে আইন বিষয়ে সার্টিফিকেট অর্জন করেন। তিনি ২০০৫ সালে জেলা আদালতে আইনজীবী হিসেবে, ২০০৭ সালে হাইকোর্ট বিভাগে এবং ২০১৮ সালে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন।

হাইকোর্টে স্থায়ী বিচারকের সংখ্যা ১০০

বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর স্থায়ী বিচারপতি হিসেবে শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে হাইকোর্ট বিভাগে স্থায়ী বিচারকের সংখ্যা ১০০ জনে দাঁড়িয়েছে।

পারিবারিক পরিচয়

বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরী সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী নিতাই রায় চৌধুরীর ছেলে।

দীর্ঘদিন আইন পেশায় থাকার পর ২০২৪ সালে হাইকোর্ট বিভাগের অতিরিক্ত বিচারপতি হিসেবে বিচারিক দায়িত্বে যুক্ত হন তিনি। স্থায়ী বিচারপতি হিসেবে শপথ নেওয়ার মাধ্যমে হাইকোর্ট বিভাগের বিচারক হিসেবে তার দায়িত্বের পরবর্তী ধাপ শুরু হলো।

সূত্র: বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (BSS)

যৌতুকের দাবিতে স্ত্রী হত্যা: মৃত্যুদণ্ডের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদানের রায়ে যে পর্যবেক্ষণ দিলেন হাইকোর্ট

যৌতুকের দাবিতে স্ত্রী হত্যা: মৃত্যুদণ্ডের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদানের রায়ে যে পর্যবেক্ষণ দিলেন হাইকোর্ট

ছবিঃ সংগৃহীত 
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ যৌতুকের দাবিতে স্ত্রীকে হত্যার দায়ে দণ্ডিত মো. সুরজ আলীর মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন। আদালত বলেছেন, নিহতের মরদেহ স্বামীর বাড়িতে পাওয়া যাওয়া, চিকিৎসা-প্রমাণে শ্বাসরোধজনিত হত্যার বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত হওয়া এবং যৌতুক দাবির পক্ষে সাক্ষ্য আসামির অপরাধ প্রমাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে দীর্ঘ কারাবাস ও অন্যান্য প্রশমনকারী পরিস্থিতি বিবেচনায় মৃত্যুদণ্ড পরিবর্তন করা হয়েছে।

বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে. এম. রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বিভাগের বেঞ্চ ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে এ রায় দেন।

মামলার প্রেক্ষাপটঃ

মামলার বিবরণ অনুযায়ী, নিহত চম্পা খাতুনের সঙ্গে আসামি মো. সুরজ আলীর প্রায় ১৫ বছর আগে বিয়ে হয়। বিয়ের সময় ৫০ হাজার টাকা যৌতুক দাবি করা হলে নিহতের পরিবার ৩০ হাজার টাকা পরিশোধ করে। পরবর্তীতে বাকি ২০ হাজার টাকা আদায়ের জন্য চম্পাকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে।

একপর্যায়ে স্থানীয় চেয়ারম্যানের উপস্থিতিতে সালিশ অনুষ্ঠিত হয় এবং বাকি ২০ হাজার টাকা পরিশোধ করা হয়। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, এরপরও আসামিপক্ষ পুনরায় ২০ হাজার টাকা যৌতুক দাবি করে। ওই টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে চম্পাকে হত্যা করা হয় এবং তাঁর মরদেহ স্বামীর বাড়ির আঙিনায় কাঁঠালগাছের নিচে ফেলে রাখা হয়।

ঘটনার খবর পেয়ে নিহতের স্বজনেরা সেখানে গিয়ে মরদেহ দেখতে পান। পরে নিহতের ভাই মো. ইদ্রিস আলী ২১ মার্চ ২০০৪ তারিখে হরিণাকুণ্ডু থানায় মামলা করেন।

মামলার তদন্ত শেষে পুলিশ চারজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করে। বিচার শেষে ঝিনাইদহ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল মো. সুরজ আলীকে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ১১(ক) ধারায় দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেন। অন্য তিন আসামিকে খালাস দেওয়া হয়।

পরবর্তীতে মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে পাঠানো হয়। একই সঙ্গে আসামি ফৌজদারি আপিল ও জেল আপিল করেন।

আদালতের পর্যবেক্ষণঃ

চিকিৎসা-প্রমাণে আত্মহত্যার দাবি সমর্থিত নয়-

হাইকোর্ট বলেন, নিহতের মরদেহ আসামির বাড়িতে পাওয়া যাওয়ার বিষয়টি আসামিপক্ষ অস্বীকার করেনি। ময়নাতদন্তে নিহতের নাক ও গলায় আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়। পরবর্তী ভিসেরা পরীক্ষায় বিষের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি।

চিকিৎসক চূড়ান্ত মতামতে জানান, নাক ও মুখ বন্ধ করে শ্বাসরোধের ফলে শ্বাসকষ্টে নিহতের মৃত্যু হয়েছে এবং তা হত্যাজনিত। আদালত চিকিৎসকের বিশেষজ্ঞ মতামত গ্রহণযোগ্য বিবেচনা করে বলেন, আত্মহত্যার বিষয়ে আসামিপক্ষের বক্তব্য চিকিৎসা-প্রমাণে সমর্থিত হয়নি।

স্ত্রীর মৃত্যুর কারণ ব্যাখ্যার দায়-

আদালতের পর্যবেক্ষণ, নিহতের মরদেহ স্বামীর বাড়িতে পাওয়া যাওয়ার পর তাঁর মৃত্যুর কারণ ব্যাখ্যা করার দায় আসামির ওপর বিশেষভাবে বর্তায়। এ মামলায় আসামি কখনো বিষপানে, আবার কখনো ফাঁসিতে আত্মহত্যার কথা বললেও সেই দাবির পক্ষে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ দিতে পারেননি।

আলিবাইয়ের দাবি প্রমাণিত হয়নি-

আসামিপক্ষের দাবি ছিল, ঘটনার রাতে সুরজ আলী বাড়িতে ছিলেন না। তবে এ বিষয়ে প্রতিরক্ষা সাক্ষী এমন কোনো প্রত্যক্ষ তথ্য দিতে পারেননি, যা থেকে প্রমাণ হয় যে আসামি ঘটনার সময় অন্য কোথাও অবস্থান করছিলেন।

হাইকোর্ট বলেন, আলিবাইয়ের দাবি সুনির্দিষ্ট ও আইনানুগ প্রমাণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করতে হয়। এ মামলায় আসামির উপস্থাপিত সাক্ষ্য তাঁর অনুপস্থিতির দাবি প্রমাণে সহায়ক হয়নি।

পুনরায় যৌতুক দাবির অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত-

আদালত বলেন, নিহতের ভাই, বাবা ও দুই চাচাতো ভাইয়ের সাক্ষ্যে বিয়ের সময় যৌতুক প্রদান, পরবর্তী সালিশ এবং পুনরায় ২০ হাজার টাকা দাবির বিষয়টি উঠে এসেছে।

বিশেষ করে নিহতের বাবা সাক্ষ্যে জানান, আসামি সরাসরি তাঁর কাছে আরও ২০ হাজার টাকা যৌতুক দাবি করেছিলেন। আদালতের মতে, জেরায় এ বক্তব্য নড়বড়ে হয়নি।

আদালত আরও পর্যবেক্ষণ করেন, বিয়ের সময় দাবিকৃত ৫০ হাজার টাকা নিয়ে বিরোধ সালিশের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হলেও পরবর্তী ২০ হাজার টাকা দাবির অভিযোগ পৃথকভাবে প্রমাণিত হয়েছে। ফলে যৌতুকের দাবিতে হত্যার অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

দীর্ঘ কারাবাস ও আইন সংশোধন বিবেচনায় সাজা পরিবর্তনঃ

হাইকোর্ট উল্লেখ করেন, আসামি দীর্ঘ সময় কারাগারে ছিলেন এবং সাত বছরের বেশি সময় কনডেম সেলে কাটিয়েছেন। আদালত তাঁর দীর্ঘ কারাবাস, অপরাধের প্রকৃতি এবং অন্যান্য প্রশমনকারী পরিস্থিতি বিবেচনা করেন।

এ ক্ষেত্রে Nalu vs. The State, 17 BLC (AD) 204 মামলার নজির উল্লেখ করা হয়। আদালত আরও বলেন, ২৫ মার্চ ২০২৫ তারিখে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ১১(ক) ধারায় সংশোধন আনা হয়েছে। ডেথ রেফারেন্স ও আপিল বিচারাধীন থাকায় সংশোধিত বিধান এ মামলায় প্রযোজ্য হবে।

এসব বিষয় বিবেচনায় আদালত মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

হাইকোর্টের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তঃ

হাইকোর্ট বিভাগ ডেথ রেফারেন্স খারিজ এবং ফৌজদারি আপিল খারিজ করেন। তবে আসামির মৃত্যুদণ্ড পরিবর্তন করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও ট্রাইব্যুনাল নির্ধারিত অর্থদণ্ড বহাল রাখেন।

একই সঙ্গে ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৫এ ধারার সুবিধা অনুযায়ী কারাবাসের সময় গণনার নির্দেশ দেন এবং আসামিকে কনডেম সেল থেকে সাধারণ বন্দিদের জন্য নির্ধারিত সেলে স্থানান্তরের আদেশ দেন। জেল আপিলও নিষ্পত্তি করা হয়।

আইনি শিক্ষাঃ

এ রায়ে আদালত দেখিয়েছেন, হত্যার অভিযোগে চিকিৎসা-প্রমাণ, প্রত্যক্ষ ও পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য এবং আসামির ব্যাখ্যা মূল্যায়ন করে অপরাধ নির্ধারণ করা হয়। একই সঙ্গে অপরাধ প্রমাণিত হলেও সাজা নির্ধারণের সময় আইন সংশোধন, কারাবাসের সময়কাল ও প্রশমনকারী পরিস্থিতি বিবেচনায় আসতে পারে।

সূত্র: Death Reference No. 43 of 2019; Criminal Appeal No. 5809 of 2019; Jail Appeal No. 133 of 2022। রায়: ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬। লিখিত রায় প্রকাশ: ২৩.০৯.২০২৬।


বিডিএলপিবি/মাসুম

পরিচয় শনাক্তকরণে ব্যর্থতা ও ত্রুটিপূর্ণ স্বীকারোক্তি: মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হাইকোর্টে খালাস: পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ

পরিচয় শনাক্তকরণে ব্যর্থতা ও ত্রুটিপূর্ণ স্বীকারোক্তি: মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হাইকোর্টে খালাস: পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ

ছবিঃ সংগৃহীত 
মামলায় প্রকৃত অপরাধীর পরিচয় প্রমাণ করতে না পারা, স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন এবং সাক্ষীদের সাক্ষ্যে অসংগতি থাকায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এক আসামিকে খালাস দিয়েছেন হাইকোর্ট বিভাগ। আদালত বলেছেন, আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণের মতো আইনসম্মত সাক্ষ্যপ্রমাণ না থাকায় তিনি খালাস পাওয়ার অধিকারী।

২০২৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্ত্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বিভাগের বেঞ্চ এ রায় দেন। আদালত মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য পাঠানো ডেথ রেফারেন্স নাকচ করেন, আসামির ফৌজদারি আপিল মঞ্জুর করেন এবং কারা আপিল নিষ্পত্তি করেন। একই সঙ্গে নিম্ন আদালতের দণ্ডাদেশ বাতিল করে আসামিকে অভিযোগ থেকে খালাস দেওয়া হয়। অন্য কোনো মামলায় আটক থাকার প্রয়োজন না থাকলে তাঁকে অবিলম্বে মুক্তির নির্দেশ দেওয়া হয়।

মামলার প্রেক্ষাপট

মামলাটি চট্টগ্রামের হাটহাজারী থানার একটি ১০ বছর বয়সী শিশু জুলী আক্তারের মৃত্যু ঘিরে। ২০০৮ সালের ১৬ মে শিশুটি তার আত্মীয়ের বাড়িতে অবস্থানকালে নিখোঁজ হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, ওই বাড়িতে কৃষিকাজের জন্য নিয়োগ করা এক ব্যক্তি নিজেকে মো. জামাল পরিচয় দিয়ে শিশুটিকে অন্য দুই শিশুর কাছ থেকে আলাদা করে নিয়ে যান।

পরিবারের সদস্যরা শিশুটিকে খুঁজতে থাকেন। পরদিনও তার সন্ধান না পাওয়ায় থানায় অভিযোগ করা হয়। ১৮ মে ২০০৮ তারিখে হাটহাজারীর একটি খাল থেকে শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

মামলার তদন্তে পুলিশ আমীর হোসেন ওরফে জামালকে গ্রেপ্তার করে। তদন্ত শেষে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ৭ ও ৯(২) ধারায় তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। তবে এজাহারে উল্লেখিত মো. জামালকে অভিযোগপত্রে আসামি করা হয়নি।

বিচার শেষে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২, চট্টগ্রাম আসামিকে ৯(২) ধারায় মৃত্যুদণ্ড ও এক লাখ টাকা জরিমানা এবং ৭ ধারায় যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা দেন। পরে মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্স পাঠানো হয়। আসামিও দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে ফৌজদারি ও জেল আপিল করেন।

আসামিপক্ষের বক্তব্য

আসামিপক্ষের আইনজীবী আদালতে বলেন, এজাহারে যে জামালের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, দণ্ডপ্রাপ্ত আমীর হোসেন সেই ব্যক্তি নন। তাঁর নাম, পিতৃপরিচয় ও ঠিকানা আলাদা। প্রকৃত জামালকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের বিষয়ে তদন্তেও যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

আসামিপক্ষ আরও দাবি করে, পুলিশি নির্যাতনের মাধ্যমে আসামির কাছ থেকে স্বীকারোক্তি আদায় করা হয়েছিল। ফলে ওই জবানবন্দি সত্য ও স্বেচ্ছায় দেওয়া হয়েছে কি না, তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে।

অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্য ছিল, সাক্ষীদের জবানবন্দি, আসামির স্বীকারোক্তি ও পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্যপ্রমাণে অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে। তাই মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন এবং আপিল খারিজের আবেদন জানানো হয়।

আদালতের পর্যবেক্ষণ

১. প্রকৃত আসামির পরিচয় প্রমাণিত হয়নিঃ

হাইকোর্টের কাছে মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছিল, এজাহারে উল্লিখিত মো. জামাল এবং দণ্ডপ্রাপ্ত আমীর হোসেন একই ব্যক্তি কি না।

আদালত লক্ষ্য করেন, তদন্তকারী কর্মকর্তা এজাহারে উল্লেখিত জামালের ঠিকানা যাচাই করে তাঁকে সেখানে পাওয়ার কথা জানালেও তিনি বিদেশে চলে গেছেন বলে দাবি করেন। কিন্তু এ তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে ইমিগ্রেশন বিভাগের সহায়তা নেওয়া হয়নি। তাঁর দেশত্যাগ-সংক্রান্ত নথিও সংগ্রহ করা হয়নি।

অন্যদিকে আমীর হোসেনের পরিচয়, পিতৃপরিচয় ও ঠিকানা নিয়ে আসামিপক্ষ সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন তুলেছিল। আদালতের মতে, আমীর হোসেনই সেই জামাল—যিনি শিশুটিকে নিয়ে গিয়েছিলেন—এমন পরিচয় নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

২. স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি গ্রহণযোগ্য নয়ঃ

আদালত বলেন, আসামি শুরু থেকেই দাবি করে আসছিলেন যে পুলিশি নির্যাতন ও চাপের মুখে তাঁর কাছ থেকে স্বীকারোক্তি আদায় করা হয়েছে। এ বিষয়ে তিনি আদালতে আবেদনও করেছিলেন এবং চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথি উপস্থাপনের অনুরোধ করেছিলেন।

কিন্তু ট্রাইব্যুনাল ম্যাজিস্ট্রেট স্বীকারোক্তিকে সত্য ও স্বেচ্ছায় দেওয়া বলে গ্রহণ করেছিলেন—এই যুক্তিতে চিকিৎসার নথি উপস্থাপনের আবেদন প্রত্যাখ্যান করেন।

হাইকোর্ট আরও দেখতে পান, ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪(৩) ধারায় স্বীকারোক্তির সত্যতা ও স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হওয়া সম্পর্কে ম্যাজিস্ট্রেটের প্রয়োজনীয় স্মারকলিপি যথাযথভাবে লিপিবদ্ধ করা হয়নি। এ প্রসঙ্গে আদালত Babul Vs. State, 63 DLR (AD) 10 মামলার নজির উল্লেখ করেন।

আদালতের সিদ্ধান্ত, স্বীকারোক্তির সত্যতা ও স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হওয়া নিশ্চিত করার আইনগত শর্ত পূরণ না হওয়ায় সেটিকে আসামির বিরুদ্ধে দণ্ডাদেশের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা যায় না।

৩. চিকিৎসা প্রতিবেদনের সঙ্গে স্বীকারোক্তির অসংগতিঃ

ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে শিশুটির মৃত্যু মাথায় আঘাত এবং পানিতে ডুবে শ্বাসরোধের সম্মিলিত প্রভাবে হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। মৃত্যুকে জীবদ্দশায় সংঘটিত ও হত্যাজনিত বলে মত দেন চিকিৎসক।

প্রতিবেদনে যৌন সংসর্গের ইতিবাচক লক্ষণের কথাও ছিল। তবে আদালত উল্লেখ করেন, প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে ধর্ষণ বা জোরপূর্বক যৌন সংসর্গের সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়নি।

অন্যদিকে স্বীকারোক্তিতে আসামি শিশুটিকে ধর্ষণ করে শ্বাসরোধে হত্যার কথা বলেছেন বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। আদালতের মতে, স্বীকারোক্তির বর্ণনার সঙ্গে ময়নাতদন্তের তথ্যের অসংগতি রয়েছে। ফলে স্বীকারোক্তিটি আসামির বিরুদ্ধে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করা যায় না।

৪. শিশু সাক্ষীদের সাক্ষ্য ও আসামি শনাক্তকরণে সমস্যাঃ

ঘটনার সময় প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে উল্লেখ করা দুই শিশু সাক্ষীর সাক্ষ্যও আদালত পর্যালোচনা করেন।

আদালত লক্ষ্য করেন, ঘটনার সময় সাক্ষী আরাফাতের বয়স ছিল প্রায় তিন বছর। জেরায় সে জানায়, আদালতে আসার আগে সংবাদদাতা তাকে আসামিকে শনাক্ত করে দেখিয়েছিলেন। তার দেওয়া উত্তরে আসামিকে নির্ভরযোগ্যভাবে শনাক্ত করার মতো ভিত্তি পাওয়া যায়নি।

অন্য শিশু সাক্ষী শাখী আক্তারের সাক্ষ্যেও অসংগতি ছিল। আদালত বলেন, এসব সাক্ষ্যের ভিত্তিতে অভিযুক্ত আমীর হোসেনই শিশুটিকে নিয়ে গিয়েছিলেন—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।

আদালত সাক্ষ্য আইনের ১১৮ ধারার আলোকে আরাফাতের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য বলে ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্তও গ্রহণ করেননি।

৫. তদন্ত ও সাক্ষ্যপ্রমাণে ঘাটতিঃ

আদালত আরও উল্লেখ করেন, এজাহারে নাম থাকা জামালকে অভিযোগপত্রে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। তাঁর বিদেশযাত্রার দাবি যাচাই করা হয়নি এবং সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সাক্ষী হিসেবেও উপস্থাপন করা হয়নি।

আসামিপক্ষের বক্তব্য ছিল, প্রকৃত অভিযুক্তকে আড়াল করে আমীর হোসেনকে মামলায় জড়ানো হয়েছে। হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণে, আমীর হোসেনকে এজাহারের জামাল হিসেবে শনাক্ত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীদের বক্তব্য ছিল দুর্বল ও অবিশ্বাসযোগ্য।

আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তঃ

সব সাক্ষ্যপ্রমাণ, চিকিৎসা প্রতিবেদন, স্বীকারোক্তি এবং উভয় পক্ষের বক্তব্য পর্যালোচনা করে হাইকোর্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে, আমীর হোসেনের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ৭ ও ৯(২) ধারার অভিযোগ প্রমাণে রাষ্ট্রপক্ষ ব্যর্থ হয়েছে।

আদালত বলেন, আসামির বিরুদ্ধে দণ্ডাদেশ দেওয়ার মতো আইনসম্মত সাক্ষ্যপ্রমাণ নেই। তিনি ১৮ বছরেরও বেশি সময় কারাগারে ছিলেন, যার মধ্যে সাত বছর কনডেম সেলে কাটিয়েছেন। আদালতের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি অনুগ্রহ হিসেবে নয়, বরং অধিকার হিসেবেই খালাস পাওয়ার যোগ্য।

ফলে ডেথ রেফারেন্স নাকচ, ফৌজদারি আপিল মঞ্জুর এবং জেল আপিল নিষ্পত্তি করা হয়। ট্রাইব্যুনালের দণ্ডাদেশ বাতিল করে আসামিকে খালাস দেওয়া হয়।

আইনি শিক্ষাঃ

এই রায়ে আদালত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেছেন—

- ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্তের পরিচয় নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্যপ্রমাণে প্রতিষ্ঠা করা অপরিহার্য।
- ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪(৩) ধারার শর্ত মেনে স্বীকারোক্তি রেকর্ড করতে হবে; জবানবন্দির স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হওয়া নিয়ে যুক্তিসংগত সন্দেহ থাকলে তা দণ্ডাদেশের ভিত্তি হতে পারে না।
- চিকিৎসা প্রতিবেদন ও স্বীকারোক্তির মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ অসংগতি থাকলে আদালতকে তা সতর্কতার সঙ্গে মূল্যায়ন করতে হবে।
- শিশু সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণের ক্ষেত্রে তার বয়স, উপলব্ধি, স্মৃতিশক্তি ও জেরায় দেওয়া উত্তরের বিশ্বাসযোগ্যতা বিবেচনা করা জরুরি।
- গুরুতর অপরাধের অভিযোগ থাকলেও আইনসম্মত ও নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্যপ্রমাণ ছাড়া কাউকে দণ্ডিত করা যায় না।

মামলা: Death Reference / Criminal Appeal / Jail Appeal
আসামি: আমীর হোসেন ওরফে জামাল
অভিযোগ: নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ৭ ও ৯(২) ধারা
রায় প্রদান: ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রায় প্রকাশ : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বেঞ্চ: বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্ত্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজা
আদালত: হাইকোর্ট বিভাগ, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
প্রাসঙ্গিক নজির: Babul Vs. State, 63 DLR (AD) 10
প্রাসঙ্গিক আইন: ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ১৬৪(৩) ধারা; সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২-এর ১১৮ ধারা; নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ৭ ও ৯(২) ধারা।

বিডিএলপিবি/মাসুম

২৫ বছর পূর্ণের আগে পদত্যাগ করলে পেনশন নয়: আপিল বিভাগের রায়

২৫ বছর পূর্ণের আগে পদত্যাগ করলে পেনশন নয়: আপিল বিভাগের রায়

চাকরি থেকে পদত্যাগের কারণে পূর্বের চাকরিকাল বাজেয়াপ্ত করার বিধান অসাংবিধানিক নয়।

সরকারি চাকরি থেকে পদত্যাগ করলে নির্ধারিত যোগ্যতাসম্পন্ন চাকরিকাল পূর্ণ হওয়ার আগে শুধু চাকরির মেয়াদের ভিত্তিতে পেনশন দাবি করা যাবে না বলে রায় দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। একই সঙ্গে বাংলাদেশ সার্ভিস রুলস, পার্ট-১-এর ৩০০(ক) বিধিতে পদত্যাগের কারণে পূর্বের চাকরিকাল বাজেয়াপ্ত করার বিধানকে সংবিধানবিরোধী নয় বলে ঘোষণা করেছেন আদালত।

১১ মার্চ ২০২৬ তারিখে বাংলাদেশ ও অন্যান্য বনাম মো. মাহবুব মুর্শেদ ও অন্যান্য (সিভিল আপিল নং ৭৭/২০২২) মামলায় এ রায় দেন আপিল বিভাগের তিন সদস্যের বেঞ্চ। বেঞ্চে ছিলেন বিচারপতি মো. রেজাউল হক, বিচারপতি এস এম এমদাদুল হক এবং বিচারপতি ফারাহ মাহবুব। সম্প্রতি লিখিত রায় প্রকাছিত হয়। মামলাটি হাইকোর্ট বিভাগের ১৮ মার্চ ২০২১ তারিখের রায় ও আদেশের বিরুদ্ধে দায়ের করা হয়েছিল।

মামলার পটভূমি

মো. মাহবুব মুর্শেদ ১৯৯১ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিসে সহকারী জজ হিসেবে যোগ দেন। অতিরিক্ত জেলা জজ হিসেবে কর্মরত অবস্থায় ৩১ জানুয়ারি ২০১১ তারিখে প্রায় ১৯ বছর চাকরির পর তিনি পদত্যাগ করেন। পরে তিনি পেনশনের আবেদন করেন। আইন ও বিচার বিভাগ তাঁর পেনশন প্রস্তাব অনুমোদন করলেও ২৫ মার্চ ২০১৫ তারিখে হিসাব ও নিরীক্ষা কর্তৃপক্ষ তা ফেরত দেয়।

এরপর তিনি সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে হাইকোর্টে রিট করেন। তাঁর দাবি ছিল, ১৯ বছর চাকরির পর পদত্যাগ করলেও তিনি পেনশনের অধিকারী এবং বাংলাদেশ সার্ভিস রুলসের ৩০০(ক) বিধিতে পদত্যাগের কারণে পূর্বের চাকরিকাল বাজেয়াপ্ত করার বিধান সংবিধানের ২৭ ও ৩১ অনুচ্ছেদের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।

হাইকোর্টের সিদ্ধান্ত

হাইকোর্ট রিটটি আংশিকভাবে মঞ্জুর করে ৩০০(ক) বিধির যে অংশে পদত্যাগের ক্ষেত্রে পূর্বের চাকরিকাল বাজেয়াপ্ত করার কথা বলা হয়েছে, তা অসাংবিধানিক ঘোষণা করেন। এরপর চাকরির মেয়াদের ভিত্তিতে পেনশন প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হয়।

আপিল বিভাগের পর্যবেক্ষণ

আপিল বিভাগ হাইকোর্টের এ সিদ্ধান্ত বাতিল করেন। আদালত বলেন, পদত্যাগ কোনো শাস্তি নয়; এটি চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় সরে যাওয়ার একটি প্রক্রিয়া। অন্যদিকে বরখাস্ত বা অপসারণ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা, যার সঙ্গে অভিযোগ ও তদন্তের বিষয় যুক্ত থাকতে পারে।

তাই পদত্যাগের কারণে পূর্বের চাকরিকাল বাজেয়াপ্ত হওয়া শাস্তি নয়; এটি পেনশন পাওয়ার ক্ষেত্রে একটি আইনগত অযোগ্যতা।

আদালত আরও বলেন, পদত্যাগ, বরখাস্ত ও অপসারণ একই বিধানে উল্লেখ থাকলেও এগুলোর আইনগত প্রেক্ষাপট ভিন্ন। ফলে ৩০০(ক) বিধানের এ ব্যবস্থা বৈষম্যমূলক নয় এবং সংবিধানের ২৭ ও ৩১ অনুচ্ছেদের পরিপন্থীও নয়।

পেনশনের ক্ষেত্রে ২৫ বছরের চাকরিকাল

আপিল বিভাগ বলেন, প্রযোজ্য আইনি কাঠামোতে অবসর ও স্বেচ্ছা অবসরের ক্ষেত্রে ২৫ বছরের যোগ্যতাসম্পন্ন চাকরিকাল গুরুত্বপূর্ণ। তবে পদত্যাগকে পেনশন পাওয়ার স্বতন্ত্র ভিত্তি হিসেবে সংশ্লিষ্ট আইনে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি।

আদালত আরও উল্লেখ করেন, সংশ্লিষ্ট পেনশন ব্যবস্থায় ২৫ বছর বা তার বেশি যোগ্যতাসম্পন্ন চাকরিকাল সম্পন্ন করার পর পদত্যাগ গ্রহণ করা হলে অবসরকালীন পেনশনের বিধান প্রযোজ্য হতে পারে। তবে ১৯ বছর চাকরির পর পদত্যাগ করা বর্তমান মামলার ক্ষেত্রে সেই যোগ্যতা পূরণ হয়নি।

৩০০(ক) বিধান নিয়ে আপিল বিভাগের সিদ্ধান্ত

আপিল বিভাগ স্পষ্টভাবে বলেন, পদত্যাগের কারণে পূর্বের চাকরিকাল বাজেয়াপ্ত করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সার্ভিস রুলসের ৩০০(ক) বিধান সংবিধানবহির্ভূত নয়। আইন যেখানে পদত্যাগের কারণে পেনশনের অধিকার সৃষ্টি করেনি, সেখানে প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের পূর্বের অনুমোদন থেকেও এমন কোনো আইনগত অধিকার সৃষ্টি হতে পারে না।

চূড়ান্ত রায়

আপিল বিভাগ সরকারের করা আপিল মঞ্জুর করে হাইকোর্ট বিভাগের ১৮ মার্চ ২০২১ তারিখের রায় ও আদেশ বাতিল করেছেন। একই সঙ্গে মামলায় খরচের আদেশ দেওয়া হয়েছে।

আইনি শিক্ষাঃ

পদত্যাগের কারণে পূর্বের চাকরিকাল বাজেয়াপ্ত করা কোনো শাস্তি নয়; এটি পদত্যাগের আইনগত পরিণতি। নির্ধারিত যোগ্যতাসম্পন্ন চাকরিকাল পূর্ণ না করে পদত্যাগ করলে শুধু চাকরির মেয়াদের ভিত্তিতে পেনশন দাবি করা যাবে না।

 

বিডিএলপিবি/মাসুম 

 

 

বন্ধকী পণ্য (Pledged Goods) নষ্ট হলেই দায় ব্যাংকের নয়: দুই মামলায় হাইকোর্টের রায় প্রকাশ

বন্ধকী পণ্য (Pledged Goods) নষ্ট হলেই দায় ব্যাংকের নয়: দুই মামলায় হাইকোর্টের রায় প্রকাশ

ছবি: সংগৃহীত 
বন্ধক রাখা পণ্য নষ্ট বা মূল্য কমে গেলেই তার দায় ব্যাংকের ওপর বর্তায় না—এমন পর্যবেক্ষণ দিয়ে দুটি অর্থঋণ-সংক্রান্ত মামলায় নিম্ন আদালতের ক্ষতিপূরণের রায় বাতিল করেছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, বন্ধকী পণ্যের আইনগত দখল ব্যাংকের কাছে ছিল—এটি প্রমাণিত না হলে কেবল ব্যাংকের পাহারাদার বা তদারকি থাকার কারণে ব্যাংককে পণ্যের জিম্মাদার (bailee) হিসেবে দায়ী করা যাবে না।

মামলা সম্পর্কে তথ্য:

হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি মো. বদরুজ্জামান ও বিচারপতি আইনুন নাহার সিদ্দিকীর সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে প্রথম আপিল নং ৩৮/২০২০ ও ৭৩/২০২০-এর রায় দেন। দুটি মামলাই অগ্রণী ব্যাংক লিমিটেড (বর্তমানে PLC)-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এবং একই ধরনের আইনগত প্রশ্ন থাকায় একসঙ্গে শুনানি করে আদালত। মামলাগুলোতে নিম্ন আদালত ব্যাংকের বিরুদ্ধে ক্ষতিপূরণের ডিক্রি দিয়েছিল। রায়টি প্রকাশিত হয় ২২/০৯/২০২৬ তারিখে।

মামলার প্রেক্ষাপট:

প্রথম মামলায় মেসার্স ইয়ানবার এগ্রো প্রোডাক্টস ইন্ডাস্ট্রিজ জাপান থেকে ব্যাংকের অর্থায়নে এমএস প্লেট আমদানি করে। এসব পণ্যের একটি অংশ দিয়ে এমএস হাউজিং পাইপ তৈরি করা হলেও প্রায় ৬৪ হাজার ৯১২ রানিং ফুট এমএস প্লেট ব্যাংকের ঋণের নিরাপত্তা হিসেবে অবশিষ্ট ছিল। বাদীপক্ষের দাবি, ব্যাংক দীর্ঘদিন এসব পণ্য বিক্রি বা সমন্বয় না করায় পণ্য নষ্ট হয়ে যায় এবং তাদের আর্থিক ক্ষতি হয়।

দ্বিতীয় মামলায় মেসার্স এ. হাসেম দেওয়ান অ্যান্ড কোং লিমিটেড জাহাজ ভাঙা ব্যবসার জন্য ব্যাংকের অর্থায়ন নেয়। জাহাজ ভাঙার পর উৎপাদিত ৮ হাজার ১৮৩ মেট্রিক টন স্ক্র্যাপের মধ্যে ৪ হাজার ২০০ মেট্রিক টন ছাড় করা হলেও অবশিষ্ট ৩ হাজার ৯৮৩ মেট্রিক টন পণ্য ব্যাংকের ঋণের নিরাপত্তা হিসেবে থেকে যায়। বাদীপক্ষের অভিযোগ ছিল, ব্যাংক অবশিষ্ট পণ্য বিক্রি বা ঋণের সঙ্গে সমন্বয় না করায় পণ্যের মূল্য কমে যায়।

নিম্ন আদালতের রায়:

দুটি মামলাতেই নিম্ন আদালত ব্যাংকের বিরুদ্ধে ক্ষতিপূরণের ডিক্রি দেন। প্রথম মামলায় ১৪ কোটি টাকা এবং দ্বিতীয় মামলায় ১ কোটি ৫৩ লাখ ২৩ হাজার ৫৪৩ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। এর বিরুদ্ধে ব্যাংক হাইকোর্টে আপিল করে।

হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ:

হাইকোর্ট বলেন, বন্ধক বা pledge-এর ক্ষেত্রে পণ্যের দখল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৃত বা গঠনমূলক দখল ব্যাংকের কাছে হস্তান্তরিত হয়েছে—এমন প্রমাণ না থাকলে শুধু ব্যাংকের নিরাপত্তাকর্মী বা তদারকির ব্যবস্থা থাকলেই ব্যাংককে bailee বা জিম্মাদার বলা যায় না। এ ক্ষেত্রে পণ্যগুলো বাদীপক্ষের নিজস্ব স্থাপনাতেই ছিল এবং সেগুলোর বাস্তব নিয়ন্ত্রণও বাদীপক্ষের কাছেই ছিল।

আদালত আরও বলেন, Contract Act-এর ১৭৬ ধারায় বন্ধকী পণ্য বিক্রি করাই ঋণ আদায়ের মামলা করার পূর্বশর্ত নয়। পাওনাদার চাইলে ঋণের জন্য মামলা করতে পারে এবং নিরাপত্তা ধরে রাখতে পারে; আবার যুক্তিসংগত নোটিশ দিয়ে বন্ধকী পণ্য বিক্রিও করতে পারে। ফলে পণ্য বিক্রি না করার বিষয়টিকে একাই ব্যাংকের চুক্তিভঙ্গ বা দায় হিসেবে দেখানো যাবে না।

ক্ষতিপূরণের দাবিতে আদালতের ব্যাখ্যা:

হাইকোর্ট বলেন, শুধু পণ্য নষ্ট হয়েছে বা মূল্য কমেছে—এমন দাবি করলেই ক্ষতিপূরণ পাওয়া যায় না। ব্যাংকের নির্দিষ্ট কোনো আইনগত বা চুক্তিগত দায়িত্ব ছিল কি না, সেই দায়িত্ব ভঙ্গ হয়েছে কি না এবং ওই ভঙ্গের কারণেই সরাসরি ক্ষতি হয়েছে কি না—এসব বিষয় প্রমাণ করতে হবে। মামলাগুলোতে বাদীপক্ষ ব্যাংকের কোনো নির্দিষ্ট কাজ বা অবহেলার কারণে পণ্য নষ্ট হয়েছে এবং দাবিকৃত ক্ষতির পরিমাণ কীভাবে নির্ধারিত হয়েছে, তা সন্তোষজনকভাবে প্রমাণ করতে পারেনি।

চূড়ান্ত রায়:

আদালত বলেন, চুক্তির শর্ত অনুযায়ী পণ্যের ক্ষতি, নষ্ট বা অবনতির ঝুঁকি বাদীপক্ষের ওপর থাকলেও কোনো চুক্তি আইনের বাধ্যতামূলক দায়িত্বকে অকার্যকর করতে পারে না। তবে এখানে ব্যাংকের বিরুদ্ধে এমন কোনো প্রমাণিত দায়িত্বভঙ্গ বা সরাসরি কার্যকারণ সম্পর্ক পাওয়া যায়নি, যার ভিত্তিতে ক্ষতিপূরণ দেওয়া যায়।

ফলে হাইকোর্ট ব্যাংকের আপিল দুটি মঞ্জুর করে নিম্ন আদালতের ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯-এর রায় ও ডিক্রি বাতিল করেন এবং উভয় মানি স্যুট খারিজ করে দেন। মামলায় কোনো খরচ আরোপ করা হয়নি।

আইনি শিক্ষা:

বন্ধকী বা pledge-এর ক্ষেত্রে শুধু ব্যাংকের কাছে পণ্যের নিরাপত্তাজনিত স্বার্থ থাকলেই ব্যাংককে পণ্যের আইনগত দখলদার বা জিম্মাদার বলা যায় না। ব্যাংকের ওপর পণ্যের ক্ষতি বা অবনতির দায় আরোপ করতে হলে দখল, নির্দিষ্ট আইনগত বা চুক্তিগত দায়িত্ব, দায়িত্বভঙ্গ এবং সেই দায়িত্বভঙ্গের সঙ্গে ক্ষতির সরাসরি কার্যকারণ সম্পর্ক প্রমাণ করতে হবে।

একইভাবে, Contract Act, 1872-এর ১৭৬ ধারা অনুযায়ী বন্ধকী পণ্য বিক্রি না করাই ব্যাংকের বিরুদ্ধে দায় সৃষ্টির জন্য যথেষ্ট নয়। ক্ষতিপূরণের দাবিতে শুধু পণ্য নষ্ট হওয়ার ঘটনা নয়, ব্যাংকের কোনো নির্দিষ্ট কাজ বা অবহেলার কারণে সেই ক্ষতি হয়েছে এবং দাবিকৃত ক্ষতির পরিমাণ প্রমাণিত হয়েছে—এ বিষয়গুলো প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।


বিডিএলপিবি/মাসুম

২৩ সেপ, ২০২৬

১৮০ দিনে বিচার শেষ না হলেও নারী ও শিশু নির্যাতন মামলা বাতিল হবে না: হাইকোর্ট

১৮০ দিনে বিচার শেষ না হলেও নারী ও শিশু নির্যাতন মামলা বাতিল হবে না: হাইকোর্ট

ছবি: সংগৃহীত 
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলায় নির্ধারিত ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ না হলেও শুধু এ কারণে বিচারিক কার্যক্রম স্থগিত বা মামলা বাতিল হবে না বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। আদালতের মতে, এ সময়সীমা বাধ্যতামূলক নয়, বরং নির্দেশনামূলক।

মামলার প্রেক্ষাপট:

মো. সাইফুল ইসলাম ওরফে পাভেল বনাম রাষ্ট্র মামলাটি ইডেন কলেজের এক শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের অভিযোগে দায়ের করা মামলাকে কেন্দ্র করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ভুক্তভোগীর মায়ের করা মামলায় পাভেলসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। পরে মামলাটি ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন হয়।

আসামি পাভেলের দাবি ছিল, ট্রাইব্যুনালে মামলা নথিভুক্ত হওয়ার পরও আইন নির্ধারিত ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ হয়নি। এ কারণে তিনি হাইকোর্টে রিট করে বিচারিক কার্যক্রম স্থগিতের আবেদন করেন। হাইকোর্ট প্রথমে বিচারিক কার্যক্রম স্থগিত করেন।

হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ:

বিচারপতি কে. এম. কামরুল কাদের ও বিচারপতি মোহাম্মদ শওকত আলী চৌধুরীর হাইকোর্ট বেঞ্চ ২০২৩ সালের ৭ জুন রায় দেন। সম্প্রতি রায়ের অনুলিপি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়েছে।

আদালত নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ২০ ও ৩১ক ধারা পর্যালোচনা করে বলেন—

* নির্ধারিত ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ না হলে মামলা স্থগিত বা বাতিল করার বিধান আইনে নেই।

* সময়সীমা অতিক্রম করলেই বিচারপ্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয়ভাবে অকার্যকর হয়ে যায় না।

* ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ করার বিধান ট্রাইব্যুনালের প্রতি নির্দেশনা; সময় পেরিয়ে যাওয়ার কারণে বিচার বন্ধ করার কোনো আইনগত পরিণতি নির্ধারিত নেই।

আদালত আরও উল্লেখ করেন, রিটকারী ২০১০ সালের ৭ নভেম্বরের পরবর্তী আদেশগুলো গোপন করেছিলেন। রিটে বিচার দীর্ঘদিন ধরে চলার যে দাবি করা হয়েছিল, আদালত তা সঠিক বলে গ্রহণ করেননি।

রায়ের ফলাফল:

হাইকোর্ট রিটের পরিপ্রেক্ষিতে জারি করা রুল খারিজ করেন এবং আগে দেওয়া বিচারিক কার্যক্রম স্থগিতের আদেশ প্রত্যাহার ও বাতিল করেন। ফলে শুধু ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ না হওয়ার যুক্তিতে মামলার বিচার বন্ধ করার আবেদন গ্রহণযোগ্য হয়নি।

আইনি শিক্ষা:

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে নির্ধারিত বিচার-সময়সীমা দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার নির্দেশনা হলেও, তা অতিক্রম করলেই মামলা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয় না। বিচার স্থগিত বা বাতিলের আবেদন করতে হলে কেবল সময়সীমা অতিক্রমের কথা নয়, প্রযোজ্য আইনগত ভিত্তিও দেখাতে হবে।


বিডিএলপিবি/মাসুম

পূর্বনিষ্পন্ন বিরোধ নতুন করে উত্থাপন করা যাবে না; প্রতারণা প্রমাণে চাই নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্য: হাইকোর্টের রায়

পূর্বনিষ্পন্ন বিরোধ নতুন করে উত্থাপন করা যাবে না; প্রতারণা প্রমাণে চাই নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্য: হাইকোর্টের রায়

ছবি: সংগৃহীত 
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন, সর্বোচ্চ আদালতে চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি হওয়া বিরোধ নতুন বা পরবর্তী মামলা করে পুনরায় উত্থাপন করা যায় না। একই সঙ্গে আদালত বলেছেন, কোনো বিরোধ সম্পর্কে আগে থেকে অবগত থাকলেই তা প্রতারণা হিসেবে গণ্য হবে না। প্রতারণার অভিযোগ প্রতিষ্ঠার জন্য নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য সাক্ষ্যপ্রমাণ থাকা আবশ্যক।

২০২৬ সালের ৩০ জুলাই বিচারপতি মো. আলী রেজার একক বেঞ্চ দিন ইসলাম সিকদার বনাম আফরোজা বেগম ও অন্যান্য (সিভিল রিভিশন নং ৬৬১/২০২৫) মামলায় এ রায় দেন। ঢাকার একটি সম্পত্তিসংক্রান্ত বিরোধে দায়ের করা এই সিভিল রিভিশনের রুল খারিজ করে দেন আদালত।

মামলার পটভূমি:

মামলার নথি অনুযায়ী, আবদুর রহমান ১৯৫৫ সালে একটি নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে বিতর্কিত সম্পত্তিটি ক্রয় করেন। পরবর্তীতে ১৯৮৭ সালে তিনি সাইফুজ্জামানকে সম্পত্তিটি ভাড়া দেন। ভাড়া বকেয়া থাকায় ১৯৯৭ সালে আবদুর রহমান উচ্ছেদ ও বকেয়া ভাড়া আদায়ের মামলা করেন। অন্যদিকে, সাইফুজ্জামান সম্পত্তির সুনির্দিষ্ট কার্যসম্পাদনের দাবিতে মামলা দায়ের করেন। উভয় মামলা একসঙ্গে শুনানি শেষে উচ্ছেদের মামলাটি ডিক্রি হয় এবং সুনির্দিষ্ট কার্যসম্পাদনের মামলাটি খারিজ হয়।

পরবর্তীতে সাইফুজ্জামান ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রিভিশন ও লিভ পিটিশন দায়ের করলেও সেগুলো খারিজ হয়ে যায়।

এদিকে, সম্পত্তিটি আইএফআইসি ব্যাংকে বন্ধক রেখে ঋণ গ্রহণ এবং পরবর্তী নিলাম কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে নতুন বিরোধের সৃষ্টি হয়। আবদুর রহমান একতরফা ডিক্রি বাতিলের আবেদন করলে তা মঞ্জুর হয়। পরবর্তী ঋণসংক্রান্ত মামলায় হাইকোর্ট বিভাগ ২০০৮ সালে আবদুর রহমানের ওপর ঋণের দায় আরোপের সিদ্ধান্ত বাতিল করেন। ২০১২ সালে আপিল বিভাগও লিভ পিটিশন খারিজ করে ওই সিদ্ধান্ত বহাল রাখেন।

এরপর বর্তমান বাদী সম্পত্তিসংক্রান্ত একটি মামলা দায়ের করেন, যা পরবর্তীতে টাইটেল স্যুট নং ১৭/২০২৩ হিসেবে নম্বরায়িত হয়। বিবাদীপক্ষ দেওয়ানি কার্যবিধির Order VII Rule 11 এবং ১১ ও ১৫১ ধারায় আরজি খারিজের আবেদন করলে বিচারিক আদালত ২০২৩ সালের ৭ মার্চ তা মঞ্জুর করেন। পরে ২০২৫ সালের ৯ জানুয়ারি আপিল আদালতও ওই সিদ্ধান্ত বহাল রাখেন। এর বিরুদ্ধে বাদী হাইকোর্ট বিভাগে সিভিল রিভিশন নং ৬৬১/২০২৫ দায়ের করেন।

আদালতের পর্যবেক্ষণ:

১. প্রতারণা অনুমাননির্ভর নয়, প্রমাণসাপেক্ষ: হাইকোর্ট বিভাগ পর্যবেক্ষণ দেন, প্রতারণার অভিযোগ কেবল অনুমানের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠা করা যায় না। এ ধরনের অভিযোগ সুনির্দিষ্টভাবে উত্থাপন করতে হবে এবং সুস্পষ্ট, নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য সাক্ষ্যপ্রমাণের মাধ্যমে তা প্রমাণ করতে হবে।

আদালতের মতে, কোনো অভিযোগ বা বিরোধ সম্পর্কে আগে থেকে জানা থাকাই আইনগতভাবে প্রতারণা প্রমাণের জন্য যথেষ্ট নয়। বরং আদালত বা অন্য কাউকে বিভ্রান্ত করে বেআইনি সুবিধা অর্জনের উদ্দেশ্যে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ইচ্ছাকৃতভাবে গোপন করা বা ভুলভাবে উপস্থাপনের বিষয়টি প্রমাণিত হতে হবে।

২. পূর্ববর্তী কার্যক্রমে প্রতারণার অভিযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়নি: বাদীপক্ষ ১৯৯২ সালের একটি আইনি নোটিশ ও চিঠির অনুলিপি উপস্থাপন করে দাবি করেন, আবদুর রহমান বন্ধকসংক্রান্ত অভিযোগ সম্পর্কে আগে থেকেই অবগত ছিলেন। তবে হাইকোর্ট বিভাগ লক্ষ করেন, পূর্ববর্তী ঋণসংক্রান্ত কার্যক্রমে এ ধরনের প্রতারণার অভিযোগ উত্থাপিত বা বিচারিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। আদালতের পর্যবেক্ষণ, পরবর্তী পর্যায়ে উত্থাপিত অভিযোগের ভিত্তিতে পূর্ববর্তী কার্যক্রমকে প্রতারণাজনিত বলে অকার্যকর ঘোষণা করার মতো পর্যাপ্ত ভিত্তি নেই।

৩. চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি হওয়া বিরোধ পুনরায় উত্থাপন করা যাবে না: আদালত বলেন, দেশের সর্বোচ্চ আদালতে কোনো বিষয় চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি হলে মামলার চূড়ান্ততার নীতি অনুসারে তা পুনরায় উত্থাপনের সুযোগ সীমিত। আইনস্বীকৃত পদ্ধতি অনুসরণ না করে নতুন বা পার্শ্ববর্তী মামলা দায়েরের মাধ্যমে সেই সিদ্ধান্তকে পুনরায় প্রশ্নবিদ্ধ করা যায় না। এ প্রসঙ্গে আদালত Abdul Jalil বনাম Islami Bank Bangladesh Limited, 7 MLR (AD) 258 মামলার নজির উল্লেখ করেন।

৪. নিম্ন আদালতের সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপের অবকাশ নেই: হাইকোর্ট বিভাগ মনে করেন, নিম্ন আদালতগুলো প্রাসঙ্গিক নথিপত্র, পূর্ববর্তী রায় এবং উচ্চতর আদালতের সিদ্ধান্তের বাধ্যতামূলক প্রভাব যথাযথভাবে বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন।

আদালতের মতে, নিম্ন আদালতের সিদ্ধান্তে এমন কোনো আইনগত ত্রুটি বা বিচারিক অসংগতি নেই, যা সংশোধনের জন্য রিভিশন আদালতের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।

আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত:

মামলার সার্বিক ঘটনা, নথিপত্র ও আইনগত দিক বিবেচনায় নিয়ে হাইকোর্ট বিভাগ সিভিল রিভিশন নং ৬৬১/২০২৫-এর রুল খারিজ করেন। একই সঙ্গে মামলায় কোনো স্থগিতাদেশ বা স্থিতাবস্থার আদেশ থাকলে তা প্রত্যাহারের নির্দেশ দেন।

আইনি শিক্ষা:

এই রায়ে আদালত মামলার চূড়ান্ততা, প্রতারণার অভিযোগ প্রমাণের দায় এবং পূর্বনিষ্পন্ন বিরোধ পুনরায় উত্থাপনের সীমা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন। কোনো বিরোধে পূর্বজ্ঞান থাকাই প্রতারণার প্রমাণ নয়; আবার সর্বোচ্চ আদালতে চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি হওয়া বিষয় নতুন মামলার মাধ্যমে পুনরায় উত্থাপনের ক্ষেত্রেও আইনগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

সূত্র: Civil Revision No. 661 of 2025, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট বিভাগ। রায়ের তারিখ: ৩০ জুলাই ২০২৬। লিখিত রায় পাবলিশ করা হয় ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে।


বিডিএলপিবি/মাসুম

২১ সেপ, ২০২৬

বাংলাদেশে আত্মহত্যায় প্ররোচনা (Abetment of Siucide): আইনি বিধান, শাস্তি ও সাক্ষ্যপ্রমাণ

বাংলাদেশে আত্মহত্যায় প্ররোচনা (Abetment of Siucide): আইনি বিধান, শাস্তি ও সাক্ষ্যপ্রমাণ

কাউকে আত্মহত্যায় প্ররোচিত করা কিংবা আত্মহত্যার কাজে সহায়তা করা ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে। বাংলাদেশে এ ধরনের অপরাধের বিচার ও শাস্তি নির্ধারণে দণ্ডবিধি, ১৮৬০ এবং বিশেষ ক্ষেত্রে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি, অভিযোগ প্রমাণে সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২-এর বিধানও প্রাসঙ্গিক।

আত্মহত্যায় প্ররোচনা কী?

আত্মহত্যায় প্ররোচনা বলতে কাউকে আত্মহত্যার দিকে উসকে দেওয়া, প্ররোচিত করা কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে সহায়তা করাকে বোঝায়। তবে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটলেই অন্য কাউকে দায়ী করা যায় না। অভিযুক্তের ভূমিকা, মানসিক উপাদান এবং ঘটনার সঙ্গে তাঁর কর্মকাণ্ডের আইনগত সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।

দণ্ডবিধির ৩০৬ ধারা: শাস্তি ও অপরাধের উপাদান

দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ৩০৬ ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি আত্মহত্যা করলে এবং অন্য কেউ তাঁকে আত্মহত্যায় প্ররোচনা দিলে, অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার শর্তে প্ররোচনাকারীর সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড হতে পারে।

এ ক্ষেত্রে ১০৭ ধারায় বর্ণিত প্ররোচনা, ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে সহায়তা কিংবা ইচ্ছাকৃত সহায়তার উপাদান থাকতে হয়। পাশাপাশি, অভিযুক্তের প্রয়োজনীয় মানসিক উপাদান এবং আত্মহত্যার সঙ্গে তাঁর আচরণের প্রাসঙ্গিক যোগসূত্রও বিবেচ্য। শুধু বিরোধ, মনোমালিন্য, অপমান কিংবা সাধারণ ঝগড়ার ঘটনা দিয়ে ৩০৬ ধারার অপরাধ স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রমাণিত হয় না।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯ক ধারা:

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ৯ক ধারায় নারীর সম্মতি ছাড়া বা ইচ্ছার বিরুদ্ধে ইচ্ছাকৃত কোনো কাজের প্রত্যক্ষ কারণে সম্ভ্রমহানির ফলে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটলে শাস্তির বিধান রয়েছে। এ অপরাধে সর্বনিম্ন পাঁচ বছর থেকে সর্বোচ্চ ১০ বছর সশ্রম কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ড হতে পারে। তবে এ ধারা প্রয়োগের ক্ষেত্রে আইনে নির্ধারিত শর্ত ও ঘটনার প্রমাণ বিবেচনা করতে হয়।

আত্মহত্যার চেষ্টা: দণ্ডবিধির ৩০৯ ধারা:

দণ্ডবিধির ৩০৯ ধারা অনুযায়ী, আত্মহত্যার চেষ্টা একটি পৃথক দণ্ডনীয় অপরাধ। এ ধারায় সর্বোচ্চ এক বছর কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।আত্মহত্যার চেষ্টা এবং আত্মহত্যায় প্ররোচনা এক নয়। প্রথমটি নিজের জীবন শেষ করার প্রচেষ্টা, আর দ্বিতীয়টির ক্ষেত্রে অন্য ব্যক্তির প্ররোচনা বা সহায়তার ভূমিকা বিবেচ্য।

অভিযোগ প্রমাণে কী বিবেচনা করে আদালত?

আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে অভিযুক্তের ফৌজদারি দায় নির্ধারণে আদালত সাধারণত বিবেচনা করেন—

* অভিযুক্তের কথাবার্তা, আচরণ ও সহায়তার প্রকৃতি;

* আত্মহত্যার সঙ্গে অভিযুক্তের কর্মকাণ্ডের আইনগত সম্পর্ক;

* প্রত্যক্ষ ও পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্যপ্রমাণ;

* অপরাধের উপাদান সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে কি না।

অপমান, হুমকি বা মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে; তবে সেগুলো একাই সব ক্ষেত্রে ৩০৬ ধারার অপরাধ প্রতিষ্ঠা করে না।

প্রাসঙ্গিক বিচারিক সিদ্ধান্ত:

১. Ramesh Kumar v. State of Chhattisgarh (2001)

ভারতের সুপ্রিম কোর্ট এ মামলায় ‘instigation’ বা প্ররোচনার অর্থ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে কাউকে কোনো কাজের দিকে উসকে দেওয়া বা উৎসাহিত করার বিষয়টি বিবেচনা করেন। আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, কোনো বক্তব্য বা আচরণকে প্ররোচনা হিসেবে গণ্য করতে হলে তার প্রকৃতি ও পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ জরুরি।

২. M. Mohan v. State (2011) : ভারতের সুপ্রিম কোর্টের এ সিদ্ধান্তে ৩০৬ ধারার অপরাধ প্রতিষ্ঠায় প্ররোচনা বা সহায়তার সুনির্দিষ্ট প্রমাণের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। সাধারণ বিবাদ বা কথাকাটাকাটিই স্বয়ংক্রিয়ভাবে আত্মহত্যায় প্ররোচনা নয়।

৩. Pramod Shriram Telgote v. State of Maharashtra (2018): বোম্বে হাইকোর্টের এ মামলায় ৩০৬ ধারার অভিযোগে অপরাধমূলক অভিপ্রায় বা mens rea এবং অভিযুক্তের আচরণের ভূমিকা বিবেচনার বিষয়টি উঠে আসে।

উল্লেখ্য, এসব ভারতীয় বিচারিক সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের আদালতের জন্য সরাসরি বাধ্যতামূলক নজির নয়; তবে প্ররোচনার ধারণা বিশ্লেষণে তুলনামূলকভাবে প্রাসঙ্গিক হতে পারে।

৪. এক্ষেত্রে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের একটি মামলার সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ: ওয়াহিদা সিফাত মামলা (২০১৭)

ঢাকার একটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে একজনকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেন। মামলায় মানসিক ও শারীরিক চাপ প্রয়োগের অভিযোগ গুরুত্ব পায়।

তবে ৬ সেপ্টেম্বর ২০২০ হাইকোর্ট বিভাগ ওই রায় বাতিল করে পুনর্বিচারের নির্দেশ দেন। এ মামলায় পারিবারিক কলহ, ঝগড়া বা প্রতিকূল পরিবেশের পাশাপাশি দণ্ডবিধির ১০৭ ধারার অধীনে প্ররোচনা কিংবা ইচ্ছাকৃত সহায়তার উপাদান প্রমাণের গুরুত্ব সামনে আসে।

সুতরাং, বাংলাদেশে ৩০৬ ধারাসংক্রান্ত বিস্তৃত আপিল-নজির তুলনামূলকভাবে সীমিত হলেও অপরাধের উপাদান ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণের প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ।

সুইসাইড নোটের সাক্ষ্যগত গুরুত্ব:

সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২-এর ৩২(১) ধারা অনুযায়ী, মৃত্যুর কারণ বা মৃত্যুর দিকে পরিচালিত পরিস্থিতি সম্পর্কে মৃত ব্যক্তির বক্তব্য নির্দিষ্ট শর্তে প্রাসঙ্গিক সাক্ষ্য হতে পারে।

এ কারণে সুইসাইড নোট আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তবে নোটে কারও নাম উল্লেখ থাকলেই তাঁর অপরাধ স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রমাণিত হয় না। নোটের সত্যতা, বক্তব্যের প্রাসঙ্গিকতা এবং অন্যান্য সাক্ষ্যপ্রমাণের সঙ্গে তার সামঞ্জস্যও বিবেচ্য।

পরিশেষে, বাংলাদেশে আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে শুধু আত্মহত্যার ঘটনা প্রমাণ করাই যথেষ্ট নয়; দণ্ডবিধির ১০৭ ও ৩০৬ ধারার প্রাসঙ্গিক উপাদান প্রতিষ্ঠা করাও জরুরি। বিশেষ ক্ষেত্রে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯ক ধারা এবং সাক্ষ্য আইনের ৩২(১) ধারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে বলেই কাউকে অপরাধী সাব্যস্ত করা যায় না। অভিযুক্তের ভূমিকা, অপরাধমূলক অভিপ্রায়, নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্যপ্রমাণ এবং প্রযোজ্য আইনের শর্ত বিবেচনা করেই আদালতকে দায় নির্ধারণ করতে হয়।

সূত্র:
১. দণ্ডবিধি, ১৮৬০ — ১০৭, ৩০৬ ও ৩০৯ ধারা
২. বাংলাদেশের আইনভান্ডার — নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ৯ক ধারা এবং সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২-এর ৩২(১) ধারা
৩. The Daily Star — ওয়াহিদা সিফাত মামলায় পুনর্বিচারের নির্দেশ
৪. Ramesh Kumar v. State of Chhattisgarh (2001); M. Mohan v. State (2011); Pramod Shriram Telgote v. State of Maharashtra (2018)—ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ও বোম্বে হাইকোর্টের সিদ্ধান্ত।

বিডিএলপিবি/মাসুম

১৭ সেপ, ২০২৬

বিচার বিভাগে বড় রদবদল: জেলা ও দায়রা জজসহ বিভিন্ন পর্যায়ের বিচারককে বদলি

বিচার বিভাগে বড় রদবদল: জেলা ও দায়রা জজসহ বিভিন্ন পর্যায়ের বিচারককে বদলি

ছবি: সংগৃহীত 
বাংলাদেশের বিচার বিভাগে বড় ধরনের রদবদল করা হয়েছে। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শক্রমে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগ থেকে জারি করা একাধিক প্রজ্ঞাপনে বিভিন্ন পর্যায়ের বিচারককে বর্তমান কর্মস্থল থেকে বদলি করে নতুন পদ ও কর্মস্থলে পদায়ন করা হয়েছে।

১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে জারি করা এসব প্রজ্ঞাপনে জেলা ও দায়রা জজ, অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ, যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ, চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটদেরকে নতুন দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

প্রজ্ঞাপনগুলোতে ঢাকা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, যশোর, বরিশাল, খুলনা, ময়মনসিংহ, সিলেট, রংপুর, কুষ্টিয়া, নরসিংদী, মাদারীপুর, গাজীপুর, নেত্রকোনা, সাতক্ষীরা, কিশোরগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও, চাঁদপুরসহ বিভিন্ন জেলার বিচারিক পদে পরিবর্তন আনা হয়েছে।

বিভিন্ন পর্যায়ের বিচারকদের এক জেলা থেকে অন্য জেলায় বদলি করা হয়েছে। একই সঙ্গে কয়েকজনকে জেলা ও দায়রা জজ, অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ, চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করা হয়েছে।

বদলি ও পদায়নের অংশ হিসেবে দেশের বিভিন্ন জেলায় চিফ লিগ্যাল এইড অফিসার পদেও বিচারকদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রজ্ঞাপনগুলোতে কিশোরগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, নরসিংদী, জয়পুরহাট, কুড়িগ্রাম, দিনাজপুর, মাগুরা, কক্সবাজার, যশোর, রাজবাড়ীসহ বিভিন্ন জেলার নাম রয়েছে।

প্রজ্ঞাপনগুলোতে বদলিকৃত বিচারকদেট ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে সংশ্লিষ্ট নতুন কর্মস্থলে যোগদানের জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রশিক্ষণ বা ছুটিতে থাকা বিচারক-কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ বা ছুটি শেষে যোগদানের তারিখে বর্তমান পদের দায়িত্বভার অর্পণ করে নতুন কর্মস্থলে যোগ দিতে বলা হয়েছে। বদলিকৃতদের পুনরাদেশ না দেওয়া পর্যন্ত নতুন পদ ও কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করতে হবে।

একই দিনে জারি করা একাধিক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে বিচার বিভাগে এই রদবদল করা হয়েছে। প্রজ্ঞাপনগুলোতে সংশ্লিষ্টদের বর্তমান পদ ও কর্মস্থল এবং বদলিকৃত পদ ও কর্মস্থলের বিস্তারিত তথ্য উল্লেখ রয়েছে।

সূত্র: আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়, আইন ও বিচার বিভাগ; ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর সংশ্লিষ্ট প্রজ্ঞাপনসমূহ যা নিচে দেওয়া হলো:
















বিডিএলপিবি/এমএম

শুধু মৃত্যুকালীন ঘোষণার ওপর নির্ভর করে কি দণ্ড প্রদান করা যায়? আইন, নীতি ও গুরুত্বপূর্ণ নজির

শুধু মৃত্যুকালীন ঘোষণার ওপর নির্ভর করে কি দণ্ড প্রদান করা যায়? আইন, নীতি ও গুরুত্বপূর্ণ নজির

ছবি: ফাইল 
কোনো ব্যক্তি মৃত্যুর আগে তার মৃত্যুর কারণ বা মৃত্যুর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পরিস্থিতি সম্পর্কে যে বক্তব্য দেন, আইনগতভাবে তা মৃত্যুকালীন ঘোষণা (Dying Declaration) হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশের সাক্ষ্য আইনে এ ধরনের বক্তব্যের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২-এর ৩২(১) ধারায় মৃত্যুকালীন ঘোষণাকে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে প্রাসঙ্গিক ও গ্রহণযোগ্য প্রমাণ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

আইনে মৃত্যুকালীন ঘোষণা কী?

সাক্ষ্য আইনের ৩২(১) ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি তার মৃত্যুর কারণ অথবা যে ঘটনার ফলে তার মৃত্যু হয়েছে, সেই ঘটনার কোনো পরিস্থিতি সম্পর্কে বক্তব্য দিলে এবং পরবর্তীতে ওই ব্যক্তির মৃত্যুর কারণ আদালতে প্রশ্নের বিষয় হলে, সেই বক্তব্য প্রাসঙ্গিক হতে পারে।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বক্তব্য দেওয়ার সময় ওই ব্যক্তি অবশ্যই মৃত্যুর আশঙ্কায় থাকতে হবে—এমন কোনো শর্ত বাংলাদেশের আইনে নেই।

এ ধরনের বক্তব্য মৌখিক বা লিখিত হতে পারে। পরিস্থিতিভেদে ইশারা বা অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমেও তা প্রকাশ করা সম্ভব। ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ কর্মকর্তা, চিকিৎসক কিংবা অন্য কোনো ব্যক্তির কাছে দেওয়া বক্তব্যও নির্দিষ্ট শর্তে বিবেচিত হতে পারে। তবে বক্তব্য কী পরিস্থিতিতে, কার মাধ্যমে এবং কীভাবে রেকর্ড করা হয়েছে—এসব বিষয় আদালত প্রমাণের গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারণের সময় বিবেচনা করেন।

শর্তাবলিঃ

সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২-এর ৩২(১) ধারা অনুযায়ী মৃত্যুকালীন জবানবন্দি (Dying Declaration)-র মূল উপাদান বা শর্তগুলো হলো- ১. যে ব্যক্তি বিবৃতি দিয়েছেন, তাকে অবশ্যই মারা যেতে হবে। ২. বিবৃতিটি অবশ্যই মৃত্যুর কারণ বা পারিপার্শ্বিক অবস্থা সম্পর্কিত হতে হবে। ৩. কার্যকারণ সম্পর্ক: মৃত্যুর কারণ এবং ঘটনার মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক থাকতে হবে। ৪. মামলাটি যখন ঐ ব্যক্তির মৃত্যুর কারণ বা পারিপার্শ্বিকতা নিয়ে হয়, তখন এই বিবৃতিটি প্রাসঙ্গিক ও আইনিভাবে গ্রহণযোগ্য সাক্ষ্য হিসেবে বিবেচিত হয়।

সাক্ষ্য আইনের সাধারণ নিয়মের ব্যতিক্রম:

সাধারণভাবে শ্রুত সাক্ষ্য (Hearsay Evidence) আদালতে গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ, যে ব্যক্তি মূল বক্তব্য দিয়েছেন, তাকে আদালতে এনে জেরা করার সুযোগ থাকে না। তবে মৃত্যুকালীন ঘোষণা এই সাধারণ নিয়মের একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনগত ব্যতিক্রম (Statutory Exception)। এক্ষেত্রে প্রচলিত নীতির সঙ্গে Nemo moriturus praesumitur mentire—অর্থাৎ মৃত্যুপথযাত্রী ব্যক্তি মিথ্যা বলবেন না—এই ধারণাটি যুক্ত করা হয়। বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত Milon @ Shahabuddin Ahmed v. State, 53 DLR 464 মামলায় মৃত্যুকালীন ঘোষণার প্রমাণের গ্রহণযোগ্যতা ও নির্ভরযোগ্যতার নীতি আলোচিত হয়েছে। এ মামলায় আদালত বলেন, “মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে থাকা একজন ব্যক্তি সাধারণত নির্দোষ কাউকে মিথ্যাভাবে জড়াবেন না, এমনকি ওই ব্যক্তির সঙ্গে তার শত্রুতাও থাকলেও।”

মৃত্যুর আশঙ্কা থাকা বাধ্যতামূলক নয়:

ইংরেজি প্রচলিত আইনের তুলনায় বাংলাদেশের আইনে মৃত্যুকালীন ঘোষণার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। সাক্ষ্য আইনের ৩২(১) ধারাই স্পষ্ট করে যে, বক্তব্য দেওয়ার সময় ওই ব্যক্তি মৃত্যুর প্রত্যাশায় ছিলেন কি না, তা বক্তব্যটির প্রাসঙ্গিকতার জন্য অপরিহার্য নয়। Humayun Matubbar v. State, 51 DLR 433 মামলায়ও বলা হয়েছে, মৃত্যুকালীন ঘোষণা দেওয়ার সময় ঘোষণাকারীকে তাৎক্ষণিক মৃত্যুর প্রত্যাশায় থাকা আবশ্যক নয়। একই সঙ্গে এর প্রাসঙ্গিকতা শুধু হত্যাজনিত মৃত্যুর ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়।

শুধু মৃত্যুকালীন ঘোষণার ভিত্তিতে কি দণ্ড হতে পারে?

হ্যাঁ, নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে পারে। কোনো মৃত্যুকালীন ঘোষণা যদি আদালতের কাছে সত্য, স্বেচ্ছাপ্রণোদিত ও নির্ভরযোগ্য (truthful, voluntary and reliable) বলে প্রতীয়মান হয়, তাহলে স্বাধীনভাবে অন্য প্রমাণ দিয়ে তার সমর্থন করা সবসময় বাধ্যতামূলক নয়। এমনকি উপযুক্ত ক্ষেত্রে শুধু একটি নির্ভরযোগ্য মৃত্যুকালীন ঘোষণাই দণ্ডের ভিত্তি হতে পারে।

ভারতের সুপ্রিম কোর্টের Khushal Rao v. State of Bombay, AIR 1958 SC 22 মামলায় বলা হয়েছে, নির্ভরযোগ্য মৃত্যুকালীন ঘোষণা একাই দণ্ডের পর্যাপ্ত ভিত্তি হতে পারে এবং প্রতিটি ক্ষেত্রে স্বাধীন সমর্থন বা corroboration বাধ্যতামূলক নয়।

বাংলাদেশেও একই ধরনের নীতি দেখা যায়। State v. Kabel Molla and others, 55 DLR 108 মামলায় একটি যথাযথভাবে রেকর্ড করা ও বিশ্বাসযোগ্য মৃত্যুকালীন ঘোষণা আসামির দণ্ডের পর্যাপ্ত ভিত্তি হতে পারে বলে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

তবে সন্দেহযুক্ত ঘোষণা গ্রহনযগ্য নয়:

মৃত্যুকালীন ঘোষণা থাকলেই আদালত তা অন্ধভাবে গ্রহণ করবেন—এমন নয়। আদালতকে বক্তব্যটির সত্যতা, স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হওয়ার বিষয়, সামঞ্জস্য এবং পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি সতর্কতার সঙ্গে বিচার করতে হয়।

State v. Babul Hossain, 52 DLR 400 মামলায় বলা হয়েছে, মৃত্যুকালীন ঘোষণার সত্যতা বা নির্ভুলতা নিয়ে সন্দেহ থাকলে শুধু সেই বক্তব্যের ওপর নিরাপদে নির্ভর করে দণ্ড দেওয়া যায় না। দণ্ডের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করার আগে আদালতকে বক্তব্যটির নির্ভরযোগ্যতা সম্পর্কে সন্তুষ্ট হতে হবে এবং তা প্ররোচিত বা শেখানো হয়েছে কি না, সেটিও বিবেচনা করতে হবে।

একইভাবে, হুমকি, জবরদস্তি, প্ররোচনা বা প্রতারণার মাধ্যমে বক্তব্য আদায় করা হলে তার ওপর নির্ভর করা নিরাপদ নয়। Sonali Bank v. Hare Krishna Das, 49 DLR 282 মামলায় এ ধরনের বক্তব্যের গ্রহণযোগ্যতা ও নির্ভরযোগ্যতার বিষয়টি বিবেচনা করা হয়েছে।

এসব বিষয় বিবেচনা করেই আদালত এর প্রমাণের গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারণ করে।

পরিশেষে, সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২-এর ৩২(১) ধারার অধীনে একটি সত্য, স্বেচ্ছাপ্রণোদিত ও নির্ভরযোগ্য মৃত্যুকালীন ঘোষণা উপযুক্ত ক্ষেত্রে স্বাধীন সমর্থন ছাড়াও দণ্ডের একমাত্র ভিত্তি হতে পারে।তবে বক্তব্যটি সন্দেহযুক্ত, অসত্য, প্ররোচিত, জবরদস্তিমূলক বা প্রতারণার মাধ্যমে নেওয়া প্রমাণিত হলে আদালত শুধু তার ওপর নির্ভর করে দণ্ড দিতে পারেন না।

তথ্যসূত্র: The Evidence Act, 1872, Section 32(1); Milon @ Shahabuddin Ahmed v. State, 53 DLR 464; Humayun Matubbar v. State, 51 DLR 433; State v. Kabel Molla and others, 55 DLR 108; State v. Babul Hossain, 52 DLR 400; Sonali Bank v. Hare Krishna Das, 49 DLR 282; Khushal Rao v. State of Bombay, AIR 1958 SC 22.

 

বিডিএলপিবি/মাসুম