 |
| ছবিঃ সংগৃহীত |
মামলায় প্রকৃত অপরাধীর পরিচয় প্রমাণ করতে না পারা, স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন এবং সাক্ষীদের সাক্ষ্যে অসংগতি থাকায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এক আসামিকে খালাস দিয়েছেন হাইকোর্ট বিভাগ। আদালত বলেছেন, আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণের মতো আইনসম্মত সাক্ষ্যপ্রমাণ না থাকায় তিনি খালাস পাওয়ার অধিকারী।
২০২৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্ত্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বিভাগের বেঞ্চ এ রায় দেন। আদালত মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য পাঠানো ডেথ রেফারেন্স নাকচ করেন, আসামির ফৌজদারি আপিল মঞ্জুর করেন এবং কারা আপিল নিষ্পত্তি করেন। একই সঙ্গে নিম্ন আদালতের দণ্ডাদেশ বাতিল করে আসামিকে অভিযোগ থেকে খালাস দেওয়া হয়। অন্য কোনো মামলায় আটক থাকার প্রয়োজন না থাকলে তাঁকে অবিলম্বে মুক্তির নির্দেশ দেওয়া হয়।
মামলার প্রেক্ষাপট
মামলাটি চট্টগ্রামের হাটহাজারী থানার একটি ১০ বছর বয়সী শিশু জুলী আক্তারের মৃত্যু ঘিরে। ২০০৮ সালের ১৬ মে শিশুটি তার আত্মীয়ের বাড়িতে অবস্থানকালে নিখোঁজ হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, ওই বাড়িতে কৃষিকাজের জন্য নিয়োগ করা এক ব্যক্তি নিজেকে মো. জামাল পরিচয় দিয়ে শিশুটিকে অন্য দুই শিশুর কাছ থেকে আলাদা করে নিয়ে যান।
পরিবারের সদস্যরা শিশুটিকে খুঁজতে থাকেন। পরদিনও তার সন্ধান না পাওয়ায় থানায় অভিযোগ করা হয়। ১৮ মে ২০০৮ তারিখে হাটহাজারীর একটি খাল থেকে শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
মামলার তদন্তে পুলিশ আমীর হোসেন ওরফে জামালকে গ্রেপ্তার করে। তদন্ত শেষে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ৭ ও ৯(২) ধারায় তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। তবে এজাহারে উল্লেখিত মো. জামালকে অভিযোগপত্রে আসামি করা হয়নি।
বিচার শেষে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২, চট্টগ্রাম আসামিকে ৯(২) ধারায় মৃত্যুদণ্ড ও এক লাখ টাকা জরিমানা এবং ৭ ধারায় যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা দেন। পরে মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্স পাঠানো হয়। আসামিও দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে ফৌজদারি ও জেল আপিল করেন।
আসামিপক্ষের বক্তব্য
আসামিপক্ষের আইনজীবী আদালতে বলেন, এজাহারে যে জামালের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, দণ্ডপ্রাপ্ত আমীর হোসেন সেই ব্যক্তি নন। তাঁর নাম, পিতৃপরিচয় ও ঠিকানা আলাদা। প্রকৃত জামালকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের বিষয়ে তদন্তেও যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
আসামিপক্ষ আরও দাবি করে, পুলিশি নির্যাতনের মাধ্যমে আসামির কাছ থেকে স্বীকারোক্তি আদায় করা হয়েছিল। ফলে ওই জবানবন্দি সত্য ও স্বেচ্ছায় দেওয়া হয়েছে কি না, তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে।
অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্য ছিল, সাক্ষীদের জবানবন্দি, আসামির স্বীকারোক্তি ও পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্যপ্রমাণে অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে। তাই মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন এবং আপিল খারিজের আবেদন জানানো হয়।
আদালতের পর্যবেক্ষণ
১. প্রকৃত আসামির পরিচয় প্রমাণিত হয়নিঃ
হাইকোর্টের কাছে মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছিল, এজাহারে উল্লিখিত মো. জামাল এবং দণ্ডপ্রাপ্ত আমীর হোসেন একই ব্যক্তি কি না।
আদালত লক্ষ্য করেন, তদন্তকারী কর্মকর্তা এজাহারে উল্লেখিত জামালের ঠিকানা যাচাই করে তাঁকে সেখানে পাওয়ার কথা জানালেও তিনি বিদেশে চলে গেছেন বলে দাবি করেন। কিন্তু এ তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে ইমিগ্রেশন বিভাগের সহায়তা নেওয়া হয়নি। তাঁর দেশত্যাগ-সংক্রান্ত নথিও সংগ্রহ করা হয়নি।
অন্যদিকে আমীর হোসেনের পরিচয়, পিতৃপরিচয় ও ঠিকানা নিয়ে আসামিপক্ষ সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন তুলেছিল। আদালতের মতে, আমীর হোসেনই সেই জামাল—যিনি শিশুটিকে নিয়ে গিয়েছিলেন—এমন পরিচয় নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
২. স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি গ্রহণযোগ্য নয়ঃ
আদালত বলেন, আসামি শুরু থেকেই দাবি করে আসছিলেন যে পুলিশি নির্যাতন ও চাপের মুখে তাঁর কাছ থেকে স্বীকারোক্তি আদায় করা হয়েছে। এ বিষয়ে তিনি আদালতে আবেদনও করেছিলেন এবং চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথি উপস্থাপনের অনুরোধ করেছিলেন।
কিন্তু ট্রাইব্যুনাল ম্যাজিস্ট্রেট স্বীকারোক্তিকে সত্য ও স্বেচ্ছায় দেওয়া বলে গ্রহণ করেছিলেন—এই যুক্তিতে চিকিৎসার নথি উপস্থাপনের আবেদন প্রত্যাখ্যান করেন।
হাইকোর্ট আরও দেখতে পান, ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪(৩) ধারায় স্বীকারোক্তির সত্যতা ও স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হওয়া সম্পর্কে ম্যাজিস্ট্রেটের প্রয়োজনীয় স্মারকলিপি যথাযথভাবে লিপিবদ্ধ করা হয়নি। এ প্রসঙ্গে আদালত Babul Vs. State, 63 DLR (AD) 10 মামলার নজির উল্লেখ করেন।
আদালতের সিদ্ধান্ত, স্বীকারোক্তির সত্যতা ও স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হওয়া নিশ্চিত করার আইনগত শর্ত পূরণ না হওয়ায় সেটিকে আসামির বিরুদ্ধে দণ্ডাদেশের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা যায় না।
৩. চিকিৎসা প্রতিবেদনের সঙ্গে স্বীকারোক্তির অসংগতিঃ
ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে শিশুটির মৃত্যু মাথায় আঘাত এবং পানিতে ডুবে শ্বাসরোধের সম্মিলিত প্রভাবে হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। মৃত্যুকে জীবদ্দশায় সংঘটিত ও হত্যাজনিত বলে মত দেন চিকিৎসক।
প্রতিবেদনে যৌন সংসর্গের ইতিবাচক লক্ষণের কথাও ছিল। তবে আদালত উল্লেখ করেন, প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে ধর্ষণ বা জোরপূর্বক যৌন সংসর্গের সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়নি।
অন্যদিকে স্বীকারোক্তিতে আসামি শিশুটিকে ধর্ষণ করে শ্বাসরোধে হত্যার কথা বলেছেন বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। আদালতের মতে, স্বীকারোক্তির বর্ণনার সঙ্গে ময়নাতদন্তের তথ্যের অসংগতি রয়েছে। ফলে স্বীকারোক্তিটি আসামির বিরুদ্ধে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করা যায় না।
৪. শিশু সাক্ষীদের সাক্ষ্য ও আসামি শনাক্তকরণে সমস্যাঃ
ঘটনার সময় প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে উল্লেখ করা দুই শিশু সাক্ষীর সাক্ষ্যও আদালত পর্যালোচনা করেন।
আদালত লক্ষ্য করেন, ঘটনার সময় সাক্ষী আরাফাতের বয়স ছিল প্রায় তিন বছর। জেরায় সে জানায়, আদালতে আসার আগে সংবাদদাতা তাকে আসামিকে শনাক্ত করে দেখিয়েছিলেন। তার দেওয়া উত্তরে আসামিকে নির্ভরযোগ্যভাবে শনাক্ত করার মতো ভিত্তি পাওয়া যায়নি।
অন্য শিশু সাক্ষী শাখী আক্তারের সাক্ষ্যেও অসংগতি ছিল। আদালত বলেন, এসব সাক্ষ্যের ভিত্তিতে অভিযুক্ত আমীর হোসেনই শিশুটিকে নিয়ে গিয়েছিলেন—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
আদালত সাক্ষ্য আইনের ১১৮ ধারার আলোকে আরাফাতের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য বলে ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্তও গ্রহণ করেননি।
৫. তদন্ত ও সাক্ষ্যপ্রমাণে ঘাটতিঃ
আদালত আরও উল্লেখ করেন, এজাহারে নাম থাকা জামালকে অভিযোগপত্রে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। তাঁর বিদেশযাত্রার দাবি যাচাই করা হয়নি এবং সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সাক্ষী হিসেবেও উপস্থাপন করা হয়নি।
আসামিপক্ষের বক্তব্য ছিল, প্রকৃত অভিযুক্তকে আড়াল করে আমীর হোসেনকে মামলায় জড়ানো হয়েছে। হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণে, আমীর হোসেনকে এজাহারের জামাল হিসেবে শনাক্ত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীদের বক্তব্য ছিল দুর্বল ও অবিশ্বাসযোগ্য।
আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তঃ
সব সাক্ষ্যপ্রমাণ, চিকিৎসা প্রতিবেদন, স্বীকারোক্তি এবং উভয় পক্ষের বক্তব্য পর্যালোচনা করে হাইকোর্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে, আমীর হোসেনের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ৭ ও ৯(২) ধারার অভিযোগ প্রমাণে রাষ্ট্রপক্ষ ব্যর্থ হয়েছে।
আদালত বলেন, আসামির বিরুদ্ধে দণ্ডাদেশ দেওয়ার মতো আইনসম্মত সাক্ষ্যপ্রমাণ নেই। তিনি ১৮ বছরেরও বেশি সময় কারাগারে ছিলেন, যার মধ্যে সাত বছর কনডেম সেলে কাটিয়েছেন। আদালতের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি অনুগ্রহ হিসেবে নয়, বরং অধিকার হিসেবেই খালাস পাওয়ার যোগ্য।
ফলে ডেথ রেফারেন্স নাকচ, ফৌজদারি আপিল মঞ্জুর এবং জেল আপিল নিষ্পত্তি করা হয়। ট্রাইব্যুনালের দণ্ডাদেশ বাতিল করে আসামিকে খালাস দেওয়া হয়।
আইনি শিক্ষাঃ
এই রায়ে আদালত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেছেন—
- ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্তের পরিচয় নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্যপ্রমাণে প্রতিষ্ঠা করা অপরিহার্য।
- ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪(৩) ধারার শর্ত মেনে স্বীকারোক্তি রেকর্ড করতে হবে; জবানবন্দির স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হওয়া নিয়ে যুক্তিসংগত সন্দেহ থাকলে তা দণ্ডাদেশের ভিত্তি হতে পারে না।
- চিকিৎসা প্রতিবেদন ও স্বীকারোক্তির মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ অসংগতি থাকলে আদালতকে তা সতর্কতার সঙ্গে মূল্যায়ন করতে হবে।
- শিশু সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণের ক্ষেত্রে তার বয়স, উপলব্ধি, স্মৃতিশক্তি ও জেরায় দেওয়া উত্তরের বিশ্বাসযোগ্যতা বিবেচনা করা জরুরি।
- গুরুতর অপরাধের অভিযোগ থাকলেও আইনসম্মত ও নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্যপ্রমাণ ছাড়া কাউকে দণ্ডিত করা যায় না।
মামলা: Death Reference / Criminal Appeal / Jail Appeal
আসামি: আমীর হোসেন ওরফে জামাল
অভিযোগ: নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ৭ ও ৯(২) ধারা
রায় প্রদান: ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
রায় প্রকাশ : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বেঞ্চ: বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্ত্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজা
আদালত: হাইকোর্ট বিভাগ, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
প্রাসঙ্গিক নজির: Babul Vs. State, 63 DLR (AD) 10
প্রাসঙ্গিক আইন: ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ১৬৪(৩) ধারা; সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২-এর ১১৮ ধারা; নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ৭ ও ৯(২) ধারা।
বিডিএলপিবি/মাসুম