![]() |
| পণ্য সরবরাহের অর্থ পরিশোধ না করলেই কোম্পানির ঋণ পরিশোধে অক্ষমতা প্রমাণিত হয় না; ত্রুটিপূর্ণ স্ট্যাটিউটরি নোটিশ ও দেনা নিয়ে সৎ ও গুরুত্বপূর্ণ বিরোধ থাকায় অবসায়নের আবেদন খারিজ |
বিচারপতি মো. তৌফিক ইনামের হাইকোর্ট বেঞ্চ Company Matter No. 442 of 2022 মামলায় গত ৩০ আগস্ট ২০২৬ তারিখে এ রায় দেন। রায়ে কোম্পানি অবসায়নের আবেদন খারিজ করা হয়। পূর্ণাঙ্গ রায়ের অনুলিপি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয় ১৩ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে।
মামলার প্রেক্ষাপট
মামলার আবেদনকারী এ এফ এম শহিদুল ইসলাম মামুন, মার্স ট্রেডিং কোম্পানির স্বত্বাধিকারী। তিনি সিগমা ফ্যাশনস লিমিটেডের বিরুদ্ধে কোম্পানি অবসায়ের আবেদন করেন। আবেদনকারীর দাবি, তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানে সরবরাহের জন্য ১৮ হাজার ৯৩৫ গজ বিভিন্ন ধরনের কাপড়ের অর্ডার দেওয়া হয়েছিল, যার মোট মূল্য ছিল ১৪ হাজার ৭১৮ দশমিক ২০ মার্কিন ডলার।
এ লেনদেনের বিপরীতে ১৮ ডিসেম্বর ২০১৯ তারিখে একটি ডকুমেন্টারি ক্রেডিট বা ঋণপত্র খোলা হয়। আবেদনকারীর বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি ২০২০ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে কয়েক দফায় কাপড় সরবরাহ করেন এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি পণ্য গ্রহণ করেন। পরবর্তী সময়ে বিল অব এক্সচেঞ্জ গ্রহণ ও অর্থ পরিশোধের নির্ধারিত তারিখ স্থির করার জন্য প্রয়োজনীয় নথি দেওয়া হলেও বিবাদীরা তা গ্রহণ করেনি বলে অভিযোগ করা হয়।
আবেদনকারী আরও দাবি করেন, বারবার তাগাদা দেওয়া এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে যাওয়ার পরও পাওনা অর্থ পরিশোধ করা হয়নি। এ অবস্থায় কোম্পানিটি ঋণ পরিশোধে অক্ষম দাবি করে কোম্পানি আইন, ১৯৯৪-এর ২৪১(৫) ধারার অধীনে অবসায়ের আবেদন করা হয়।
কোম্পানির বক্তব্য
আবেদনের বিরোধিতা করে সিগমা ফ্যাশনস লিমিটেডের পক্ষ থেকে বলা হয়, পাওনা অর্থ নিয়ে প্রকৃত ও গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক বিরোধ রয়েছে। কোম্পানির দাবি, চুক্তিতে নির্ধারিত ৩০ জানুয়ারি ২০২০ তারিখের মধ্যে পণ্য সরবরাহের কথা থাকলেও আবেদনকারী ১৩ ও ২০ ফেব্রুয়ারি পণ্য সরবরাহ করেন। এতে বিদেশি ক্রেতা রপ্তানি আদেশ বাতিল করে এবং কোম্পানির আর্থিক ক্ষতি হয় বলে অভিযোগ করা হয়।
এ ছাড়া সরবরাহ করা পণ্যের গুণগত মান, চুক্তির শর্ত অনুসরণ এবং পক্ষগুলোর মধ্যে পরবর্তী সময়ে অর্থ সমন্বয় বা দাবি ছাড় দেওয়ার বিষয়ে সমঝোতার প্রশ্নও উত্থাপন করা হয়। কোম্পানির পক্ষ থেকে আরও বলা হয়, ২৪ এপ্রিল ২০২২ তারিখের স্ট্যাটিউটরি নোটিশে সাত দিনের মধ্যে অর্থ পরিশোধের কথা বলা হয়েছিল, যদিও কোম্পানি আইন, ১৯৯৪-এর ২৪২ ধারায় এ ধরনের দাবির ক্ষেত্রে অন্তত তিন সপ্তাহ সময় দেওয়ার বিধান রয়েছে।
আদালতের পর্যবেক্ষণ
হাইকোর্ট বলেন, পণ্য সরবরাহের বিষয়টি স্বীকার করা হলেও তা দিয়ে দাবিকৃত সম্পূর্ণ অর্থ নিঃশর্তভাবে পাওনা হয়ে গেছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পণ্য সরবরাহ করা হয়েছিল কি না, পণ্যের গুণগত মান চুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল কি না, বিলম্বের কারণে কোনো ক্ষতি হয়েছে কি না এবং কোনো অর্থ সমন্বয় বা সমঝোতা হয়েছিল কি না—এসব বিষয় সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে নির্ধারণ করতে হবে।
আদালত মনে করেন, এসব অভিযোগকে এ পর্যায়ে কেবল কাল্পনিক বা ভিত্তিহীন বিরোধ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। এগুলো সরাসরি সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যিক লেনদেনের সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে এসব প্রশ্নের নিষ্পত্তি না করে দাবিকৃত অর্থকে অবিতর্কিত দেনা হিসেবে ধরে কোম্পানি অবসায়ের আদেশ দেওয়া যায় না।
রায়ে আরও বলা হয়, কোম্পানি অবসায়ের এখতিয়ার কোনো বিতর্কিত বাণিজ্যিক দাবি সংক্ষিপ্ত পদ্ধতিতে নিষ্পত্তি করার বিকল্প ফোরাম নয়। কোনো কোম্পানির বিরুদ্ধে অর্থ পরিশোধের দাবি থাকলেই পাওনাদার অবসায়নের আবেদন করতে পারবেন না, যদি কোম্পানিটি দায়ের অস্তিত্ব বা পরিমাণ নিয়ে প্রকৃত ও গুরুত্বপূর্ণ বিরোধ উত্থাপন করে।
স্ট্যাটিউটরি নোটিশে আইনি ত্রুটি
আদালত আবেদনকারীর পাঠানো স্ট্যাটিউটরি নোটিশের বৈধতা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দেন। কোম্পানি আইন, ১৯৯৪-এর ২৪২(১)(i) ধারার অধীনে কোম্পানিকে দেনা পরিশোধ, নিরাপত্তা প্রদান অথবা পাওনাদারের সন্তুষ্টি অনুযায়ী দেনা নিষ্পত্তির জন্য আইননির্ধারিত সময় দিতে হয়।
হাইকোর্টের মতে, সংশ্লিষ্ট নোটিশে সাত দিনের মধ্যে অর্থ পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আইনে নির্ধারিত সময় তিন সপ্তাহ। ফলে ওই নোটিশকে আইনসম্মত স্ট্যাটিউটরি ডিমান্ড হিসেবে গণ্য করা যায় না। নোটিশে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও দেনাদার কোম্পানিকে চিহ্নিত করার ক্ষেত্রেও অস্পষ্টতা ছিল, যা নোটিশটির কার্যকারিতা আরও দুর্বল করেছে।
আদালত আরও বলেন, শুধু দাবিকৃত অর্থ পরিশোধ না করার ঘটনা দিয়ে কোম্পানির সামগ্রিকভাবে ঋণ পরিশোধে অক্ষমতা প্রমাণিত হয় না। এ ক্ষেত্রে আবেদনকারী কোম্পানিটির সাধারণ আর্থিক অক্ষমতা প্রমাণের জন্য পর্যাপ্ত উপাদান উপস্থাপন করতে পারেননি।
রায়ে যে সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে
হাইকোর্ট সিদ্ধান্ত দেন, আবেদনকারী সিগমা ফ্যাশনস লিমিটেডের বিরুদ্ধে ১৪ হাজার ৭১৮ দশমিক ২০ মার্কিন ডলারের একটি সুস্পষ্ট, অবিতর্কিত ও বর্তমানে বলবৎযোগ্য দেনা প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি। পাশাপাশি, কোম্পানি আইন, ১৯৯৪-এর ২৪২(১)(i) ধারার শর্ত অনুযায়ী স্ট্যাটিউটরি নোটিশও দেওয়া হয়নি।
আদালত স্পষ্ট করেন, এ আবেদন খারিজের অর্থ এই নয় যে আবেদনকারীর মূল পাওনা দাবির চূড়ান্ত মেরিট নির্ধারণ করা হয়েছে। উপযুক্ত ফোরামে প্রমাণ করতে পারলে যে অর্থ প্রকৃতপক্ষে পাওনা রয়েছে, সে অর্থ আদায়ে আবেদনকারী আইনানুগ অন্য প্রতিকার চাইতে পারবেন। এ রায় তাঁর অন্য আইনগত প্রতিকার গ্রহণের পথে বাধা হবে না।
এসব বিবেচনায় হাইকোর্ট কোম্পানি আইন, ১৯৯৪-এর ২৪১(৫) ও ২৪২ ধারার অধীনে কোম্পানি অবসায়ের যথেষ্ট ভিত্তি না পাওয়ায় Company Matter No. 442 of 2022 খারিজ করেন এবং সংশ্লিষ্ট আরজেএসসি রেকর্ড ফেরত পাঠানোর নির্দেশ দেন।
মামলার তথ্য: Company Matter No. 442 of 2022; বিচারপতি মো. তৌফিক ইনাম; রায়ের তারিখ: ৩০ আগস্ট ২০২৬; প্রাসঙ্গিক আইন: কোম্পানি আইন, ১৯৯৪-এর ২৪১(৫), ২৪২ ও ২৪৫ ধারা।
বিডি ল' পোস্ট/মাসুম

0 coment rios: