![]() |
| ছবি: সংগৃহীত |
সম্প্রতি দেওয়া এক রায়ে হাইকোর্টের বিচারপতি মো. বশির উল্লাহ এ পর্যবেক্ষণ দেন। আদালত ক্রিমিনাল আপিল নং- ৬৮৬৭/২০১৮, নিজাম উদ্দিন মাহমুদ বনাম নাজিনা হাসিন, এ আপিল মঞ্জুর করে আসামি নাজিনা হাসিনের খালাসের রায় বাতিল করেন। একই সঙ্গে তাকে নেগোসিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট, ১৮৮১-এর ১৩৮ ধারায় দোষী সাব্যস্ত করে ছয় মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং ২৫ লাখ টাকা জরিমানা করেন। রায়টি ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ দেওয়া হয়। এবং সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটপ প্রকাশিত হয় ১৭ অক্টোবর, ২০২৬ তারিখে।
মামলার ঘটনা
মামলার বাদী নিজাম উদ্দিন মাহমুদ স্টক ট্রেডিং ও স্টক এক্সচেঞ্জ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আসামির সঙ্গে বিভিন্ন লেনদেনের পর তার কাছে বাদীর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ টাকা পাওনা হয়। পরে ২৬ এপ্রিল ২০১২ উভয় পক্ষের মধ্যে সমঝোতা হয়। ওই সমঝোতার ভিত্তিতে আইনগতভাবে আদায়যোগ্য দায় পরিশোধের জন্য আসামি বাদীকে পাঁচটি চেক দেন।
এর মধ্যে ১০২৮০৮১ নম্বর চেকটি ছিল ২০ মে ২০১২ তারিখের এবং এর মূল্য ছিল ২৫ লাখ টাকা। চেকটি ১০ সেপ্টেম্বর ২০১২ ব্যাংকে জমা দেওয়া হলে ১১ সেপ্টেম্বর অপর্যাপ্ত তহবিলের কারণে তা ডিজঅনার হয়। এরপর ১৯ সেপ্টেম্বর আসামিকে আইনি নোটিশ পাঠানো হয়, যা ২৫ সেপ্টেম্বর তার ঠিকানায় পৌঁছায়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে টাকা পরিশোধ না করায় ২১ নভেম্বর ২০১২ মামলা করা হয়।
ট্রায়াল কোর্টে খালাস
মামলায় বাদী ও আসামি—উভয় পক্ষ একজন করে সাক্ষী উপস্থাপন করেন। বিচার শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন জয়েন্ট সেশনস জজ, প্রথম আদালত ১৪ মার্চ ২০১৮ আসামিকে খালাস দেন। আদালতের ওই রায়ের বিরুদ্ধে বাদী হাইকোর্টে আপিল করেন।
আপিল চলাকালে চেকের ডিজঅনার স্লিপ নিয়ে বিষয়টি সামনে আসে। হাইকোর্টের নির্দেশে অতিরিক্ত সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। সেখানে ব্যাংক কর্তৃক সত্যায়িত ডিজঅনার স্লিপ এবং মূল ব্যাংক স্টেটমেন্ট দাখিল করা হয়। আসামি ওই অতিরিক্ত সাক্ষ্যের সময় উপস্থিত থাকলেও বাদীকে জেরা করেননি এবং প্রদর্শিত নথির বিরুদ্ধে কোনো আপত্তিও জানাননি।
ডিজঅনার স্লিপ হারিয়ে গেলেও প্রমাণ নষ্ট হয় না
হাইকোর্ট রায়ে বলেন, বাদী সাক্ষ্য দেওয়ার সময় ডিজঅনার স্লিপ প্রদর্শনী হিসেবে দাখিল করেছিলেন। আদালতের নথি অনুযায়ী সেটি প্রদর্শনী-২ হিসেবে চিহ্নিতও হয়েছিল। পরবর্তীতে মূল কাগজটি নথিতে পাওয়া না গেলেও, আগে আদালতে তা দাখিল ও প্রদর্শিত হয়েছিল—এই প্রমাণকে শুধু পরবর্তী সময়ে কাগজটি অনুপস্থিত থাকার কারণে অগ্রাহ্য করা যায় না।
আদালত আরও বলেন, মূল ব্যাংক স্টেটমেন্টে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে সংশ্লিষ্ট চেকটি ১১ সেপ্টেম্বর ২০১২ অপর্যাপ্ত তহবিলের কারণে ডিজঅনার হয়েছিল। ফলে শুধু ডিজঅনার স্লিপের অনুপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে ট্রায়াল কোর্টের খালাসের সিদ্ধান্ত আইনসম্মত নয়।
আইনি নোটিশের সার্ভিস নিয়েও আপত্তি টেকেনি
আসামি নাজিনা হাসিন তার ঠিকানা হিসেবে ঢাকার মতিঝিলে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ ভবনের ৩১১ ও ৩১২ নম্বর কক্ষের ঠিকানা উল্লেখ করেছিলেন। বাদী ওই ঠিকানাতেই নিবন্ধিত ডাকযোগে আইনি নোটিশ পাঠান এবং অ্যাকনলেজমেন্ট ডিউ থেকে নোটিশ প্রাপ্তির প্রমাণ পাওয়া যায়।
হাইকোর্ট বলেন, জেনারেল ক্লজেস অ্যাক্ট, ১৮৯৭-এর ২৭ ধারার অধীনে সঠিক ঠিকানায় নিবন্ধিত ডাকযোগে পাঠানো নোটিশ যথাযথভাবে সার্ভ হয়েছে বলে আইনগত অনুমান সৃষ্টি হয়। আসামি ওই অনুমান খণ্ডনের মতো কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেননি।
‘সিকিউরিটি চেক’ দাবি যথেষ্ট নয়
আসামির দাবি ছিল, সংশ্লিষ্ট তিনটি চেক নিরাপত্তা হিসেবে দেওয়া হয়েছিল। তবে জেরায় তিনি পাঁচটি চেক দেওয়ার কথা স্বীকার করেন এবং বাদীর সঙ্গে সমঝোতার পর এসব চেক দেওয়ার বিষয়টিও তার বক্তব্যে উঠে আসে। এছাড়া ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে আসামির দেওয়া একটি প্রতিনিধিত্বপত্রেও পাঁচটি চেক দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ ছিল।
হাইকোর্ট বলেন, চেকের স্বাক্ষর ও ইস্যুর বিষয়টি স্বীকার বা প্রমাণিত হলে নেগোসিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট-এর ১১৮(ক) ধারার আইনগত অনুমান কার্যকর হয়। শুধু মৌখিকভাবে চেকটি ‘সিকিউরিটি চেক’ ছিল বা কোনো দেনা ছিল না—এমন দাবি করলেই ওই আইনগত অনুমান খণ্ডিত হয় না; এর জন্য গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ প্রয়োজন।
ডিজঅনার স্লিপ একমাত্র প্রমাণ নয়
হাইকোর্টের গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো, ব্যাংকের ডিজঅনার স্লিপ বা রিটার্ন মেমো চেক ফেরত আসার বিষয়টি প্রমাণের একটি শক্তিশালী মাধ্যম হলেও এটি একমাত্র বা অপরিহার্য প্রমাণের মাধ্যম নয়।
আদালত বলেন, ধারা ১৩৮-এর মামলায় মূল বিষয় হলো—চেক উপস্থাপন করা হয়েছিল কি না, তা ডিজঅনার হয়েছে কি না, আইনি নোটিশ দেওয়া হয়েছে কি না এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে টাকা পরিশোধ করা হয়নি কি না। এসব বিষয় অন্য গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য সাক্ষ্য-প্রমাণে প্রমাণিত হলে শুধু ডিজঅনার স্লিপ না থাকার কারণে মামলাটি ব্যর্থ হবে না।
আদালতের মতে, ট্রায়াল কোর্ট ডিজঅনার স্লিপ প্রদর্শিত না হওয়ার বিষয়টিকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিয়ে পুরো সাক্ষ্য-প্রমাণের সামগ্রিক প্রভাব বিবেচনা করেনি। এ ধরনের পদ্ধতি প্রমাণ মূল্যায়নে অতিরিক্ত টেকনিক্যাল দৃষ্টিভঙ্গির শামিল।
খালাসের রায় বাতিল, ছয় মাসের কারাদণ্ড
সবশেষে হাইকোর্ট বাদী-আপিলকারী চেকের দায়, চেক উপস্থাপন, ডিজঅনার, আইনি নোটিশ এবং নির্ধারিত সময়ে টাকা পরিশোধ না করার বিষয় প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন বলে সিদ্ধান্ত দেন। ট্রায়াল কোর্টের খালাসের রায়কে আইনগতভাবে টেকসই নয় বলে উল্লেখ করে তা বাতিল করা হয়।
ফলে আপিল মঞ্জুর করে নাজিনা হাসিনকে ধারা ১৩৮-এর অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। তাকে ছয় মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং ২৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জরিমানার অর্থ বাদীকে পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে তাকে রায়ের কপি পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে ট্রায়াল কোর্টে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিডি ল' পোস্ট/মাসুম

0 coment rios: