১২ অক্টো, ২০২৬

বিয়ের শর্ত বা প্রতিদান ছাড়া স্ত্রীর কাছে সরাসরি টাকা দাবি যৌতুক নিরোধ আইনে অপরাধ নয়: হাইকোর্ট

বিয়ের শর্ত বা প্রতিদান হিসেবে দাবি করা না হলে স্বামীর অর্থ দাবি যৌতুক হিসেবে গণ্য হবে না; খালাসের বিরুদ্ধে স্ত্রীর করা রিভিশন খারিজ।
স্ত্রীর কাছে সরাসরি টাকা দাবি করলেই তা যৌতুক নিরোধ আইন, ১৯৮০-এর ৪ ধারার অধীন অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে না বলে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, দাবিকৃত অর্থকে যৌতুক হিসেবে গণ্য করতে হলে আইনে নির্ধারিত সংজ্ঞার শর্ত পূরণ করতে হবে। বিয়ের প্রতিদান হিসেবে দাবি করা হয়নি—এমন অর্থ বা সম্পত্তির দাবি শুধু অর্থ দাবি হওয়ার কারণে যৌতুক হয়ে যায় না।

২০২৪ সালের ৬১৭৬ নম্বর ফৌজদারি রিভিশন মামলা, মাহবুবা মোহাম্মদ বাবন বনাম রাষ্ট্র ও অন্য একজন-এ বিচারপতি মো. সালিমের একক বেঞ্চ ২০২৬ সালের ১৫ জুন এ রায় দেন। এতে স্বামীর খালাসের বিরুদ্ধে স্ত্রীর করা রিভিশন খারিজ করে নিম্ন আদালতের দেওয়া খালাসের রায় বহাল রাখেন হাইকোর্ট। রায়টি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয় ১১ অক্টোবর, ২০২৬।

মামলার পটভূমি:

মামলার আবেদনকারী মাহবুবা মোহাম্মদ বাবনের সঙ্গে বিবাদী মো. মাহমুদুল আলম সোহাগের ২০১৫ সালের ৫ নভেম্বর মুসলিম শরিয়াহ অনুযায়ী বিয়ে হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, বিয়ের পর স্বামী স্ত্রীকে নিজের বাড়িতে নিয়ে যাননি। পরে ২০১৬ সালের ১৮ এপ্রিল স্ত্রীর বাবার বাড়িতে গিয়ে তিনি গাড়ি কেনার জন্য এক কোটি ৫০ লাখ টাকা, বহুতল ভবন নির্মাণের জন্য দুই কোটি টাকা এবং ব্যবসার জন্য এক কোটি টাকা দাবি করেন। সব মিলিয়ে দাবির পরিমাণ ছিল চার কোটি ৫০ লাখ টাকা।

অভিযোগে আরও বলা হয়, দাবিকৃত অর্থ দেওয়া না হলে স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয় এবং তাঁকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়। পরবর্তী সময়ে ২৮ মে ২০১৬ তারিখে স্ত্রীপক্ষের কয়েকজন বিবাদীর বাড়িতে গিয়ে বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করেন। সেখানেও যৌতুক ছাড়া স্ত্রীকে সংসারে গ্রহণ করা হবে না বলে জানানো হয়—এমন অভিযোগ করেন বাদীপক্ষ।

এ ঘটনায় স্ত্রী যৌতুক নিরোধ আইন, ১৯৮০-এর ৪ ধারায় মামলা করেন।

নিম্ন আদালতে স্বামীর খালাস:

মামলার বিচারকালে প্রসিকিউশন চারজন সাক্ষী এবং আসামিপক্ষ একজন সাক্ষী উপস্থাপন করে। বিচার শেষে গাজীপুরের মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-৪ ২০২২ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি আসামিকে অভিযোগ থেকে খালাস দেন।

পরবর্তী সময়ে গাজীপুরের অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত-৪ ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই ফৌজদারি আপিল নম্বর ২৪৪/২০২৩ খারিজ করে নিম্ন আদালতের রায় বহাল রাখেন। এর বিরুদ্ধে হাইকোর্টে ফৌজদারি রিভিশন দায়ের করেন স্ত্রী।

হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ:

আদালত মামলার সাক্ষ্য-প্রমাণ ও নথি পর্যালোচনা করে বলেন, বাদী তাঁর স্বামীর বিরুদ্ধে সরাসরি অর্থ দাবি করার অভিযোগ করেছেন। কিন্তু ওই অর্থের দাবি যৌতুক নিরোধ আইন, ১৯৮০-এর অধীন যৌতুকের সংজ্ঞা পূরণ করে কি না, সেটিই ছিল মামলার গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্রশ্ন।

রায়ে আদালত উল্লেখ করেন, শুধু অর্থ দাবি করলেই তা যৌতুকের অপরাধ হবে না। দাবিকৃত অর্থ বা সম্পত্তিকে আইনের সংজ্ঞা অনুযায়ী যৌতুক হতে হবে। আদালত আরও বলেন, স্বামী সরাসরি স্ত্রীর কাছে অর্থ দাবি করলে, সেই দাবি নিজে থেকেই যৌতুক নিরোধ আইনের ৪ ধারার আওতায় পড়ে না।

এ প্রসঙ্গে আদালত Mahir Lal Saha Poddar @ Mihir Kumar Poddar, Motilal Shaha বনাম Zhunu Rani Saha মামলার নজির উল্লেখ করেন, যা ৩৭ ডিএলআর (১৯৮৫)-এর ২২৭ পৃষ্ঠায় প্রকাশিত। ওই মামলায় বলা হয়েছিল, বিয়ের প্রতিদান হিসেবে দাবি করা না হলে শুধু অর্থ বা সম্পত্তির দাবিকে যৌতুক বলা যায় না।

এ ছাড়া Anamul Hoque Faraji বনাম Mahabuba Begum and others মামলার নজিরও বিবেচনায় নেওয়া হয়, যা ২৮ বিএলসি (হাইকোর্ট বিভাগ)-এর ৬৮৮ পৃষ্ঠায় প্রকাশিত। ওই নজির অনুযায়ী, যৌতুক নিরোধ আইন, ১৯৮০-এর ৪ ধারা প্রয়োগের ক্ষেত্রে কনের বা বরের বাবা-মা কিংবা অভিভাবকের কাছে যৌতুক দাবি করার বিষয়টি প্রাসঙ্গিক; স্ত্রীর কাছে সরাসরি অর্থ দাবি করলেই তা ওই ধারার অপরাধের আওতায় আসে না।

সাক্ষ্য-প্রমাণ মূল্যায়ন:

হাইকোর্ট বলেন, বিচারিক আদালত মৌখিক ও দালিলিক সাক্ষ্য-প্রমাণ বিশদভাবে পর্যালোচনা করে আসামিকে খালাস দিয়েছিলেন। আপিল আদালতও সাক্ষ্য-প্রমাণ বিবেচনা করে সেই সিদ্ধান্ত বহাল রাখেন। হাইকোর্টের দৃষ্টিতে, নিম্ন আদালত ও আপিল আদালতের সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করার মতো যথেষ্ট কারণ পাওয়া যায়নি।

রিভিশন খারিজ, খালাস বহাল:

সব দিক বিবেচনায় হাইকোর্ট রিভিশনের রুলের কোনো গ্রহণযোগ্য ভিত্তি খুঁজে পাননি। ফলে রুল খারিজ করা হয় এবং গাজীপুরের অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত-৪-এর ২০২৪ সালের ১৬ জুলাইয়ের আদেশ বহাল রাখা হয়। এর মাধ্যমে স্বামীর খালাসের সিদ্ধান্ত কার্যকর থাকে।

আইনি শিক্ষা:

এই কেস নোটটি আপলোড করা রায়ের ভিত্তিতে তৈরি। রায়ের ১৯–২০ পৃষ্ঠায় উদ্ধৃত আইনি নীতি ও নজিরের আলোকে প্রতিবেদনটি লেখা হয়েছে। তবে রায়ে সাক্ষ্য-প্রমাণের মূল্যায়ন নিয়েও আলোচনা রয়েছে; তাই রায়টিকে সব ধরনের অর্থ দাবির ক্ষেত্রে সাধারণ নিয়ম হিসেবে না দেখে সংশ্লিষ্ট আইনের সংজ্ঞা ও মামলার নির্দিষ্ট তথ্যের প্রেক্ষাপটে পড়া উচিত।


বিডিএলপিবি/মাসুম


শেয়ার করুন

0 coment rios: