২৭ সেপ, ২০২৬

উচ্চ আদালতের আদেশ তার প্রকৃত অর্থ অনুযায়ী বাস্তবায়ন করতে হবে, দেওয়া যাবে না মনগড়া ব্যাখ্যা : হাইকোর্ট

ছবি: সংগৃহীত 
উচ্চতর আদালতের কোনো আদেশ তার প্রকৃত অর্থ ও কার্যকারিতা অনুযায়ী পালন করতে হবে। কোনো অধস্তন কর্তৃপক্ষ বা পক্ষ এমনভাবে ওই আদেশের ব্যাখ্যা বা প্রয়োগ করতে পারে না, যাতে উচ্চতর আদালতের স্পষ্ট নির্দেশনা ব্যর্থ হয়। এমন পর্যবেক্ষণ এসেছে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের এক রায়ে।

Civil Revision No. 6619 of 2023 মামলায় বিচারপতি মো. আলী রেজা ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে রায় দেন। মামলাটি ছিল Aziz Al Kaisar vs. Mrs. Tabassum Kaisar and others। এর পূর্ণাঙ্গ রায় সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত হয়।

মামলার নথি অনুযায়ী, বাদী আজিজ আল কায়সার ঢাকার প্রথম যুগ্ম জেলা জজ আদালতে Title Suit No. 899 of 2023 দায়ের করেন। এতে তিনি দাবি করেন, বিবাদী নং ১ নিজের অর্থে সিটি ব্যাংক লিমিটেডের নির্দিষ্ট শেয়ার এবং ওই শেয়ার থেকে অর্জিত লভ্যাংশ ক্রয় করেননি। বাদীর দাবি ছিল, ১৯৯৩ থেকে ২০০২ সালের মধ্যে শেয়ারগুলো তার কাছ থেকে হস্তান্তরসহ বিভিন্ন উপায়ে বিবাদী নং ১-এর নামে যায় এবং এর মূল্য তিনি পরিশোধ করেন। একই সঙ্গে ওই শেয়ার ও লভ্যাংশের ওপর বিবাদী নং ১-এর কোনো স্বত্ব বা অধিকার নেই—এমন ঘোষণাও চাওয়া হয়।

মামলা দায়েরের দিনই বাদী দেওয়ানি কার্যবিধির Order 39 Rules 1 and 2 read with Section 151-এর অধীনে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার আবেদন করেন। তবে বিচারিক আদালত আবেদনটি শুনানির জন্য ১১ জানুয়ারি ২০২৪ তারিখ নির্ধারণ করেন। পরে ১৯ নভেম্বর ২০২৩ তারিখেও বাদী পৃথক একটি আবেদন করেন। ওই আদেশে অসন্তুষ্ট হয়ে তিনি হাইকোর্টে পুনর্বিবেচনার আবেদন দায়ের করেন।

হাইকোর্ট ৬ ডিসেম্বর ২০২৩ তারিখে অন্তর্বর্তীকালীন নিষেধাজ্ঞা দিয়ে সংশ্লিষ্ট শেয়ার হস্তান্তর বা বিক্রয়ের ওপর এবং নির্দিষ্ট ব্যাংক হিসাবে থাকা ওই শেয়ারসংক্রান্ত নগদ লভ্যাংশের বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। পরে বিবাদী নং ১ আপিল বিভাগে Civil Petition for Leave to Appeal No. 82 of 2024 দায়ের করেন। ১৪ জানুয়ারি ২০২৪ তারিখে আপিল বিভাগের চেম্বার বিচারক হাইকোর্টের আদেশ সংশোধন করে বিবাদী নং ১-এর প্রাপ্ত নগদ লভ্যাংশের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেন। পরবর্তীতে ২৯ এপ্রিল ২০২৪ তারিখে আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ ওই সংশোধিত আদেশটি বিধি নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বহাল রাখেন।

হাইকোর্ট রায়ে বলেন, আপিল বিভাগের ১৪ জানুয়ারি ২০২৪-এর সংশোধিত আদেশে বিবাদী নং ১-কে সংশ্লিষ্ট শেয়ার থেকে অর্জিত নগদ লভ্যাংশ গ্রহণে বাধা দেওয়া হয়নি। বরং ২৯ এপ্রিল ২০২৪-এর আদেশে ওই সংশোধিত আদেশটি বিধি নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বহাল রাখা হয়। ফলে ১৪ জানুয়ারি ২০২৪ থেকে বিধি নিষ্পত্তির তারিখ পর্যন্ত বিবাদী নং ১ সংশ্লিষ্ট নগদ লভ্যাংশ গ্রহণের অধিকারী ছিলেন।

রায়ে আদালত আরও বলেন, ন্যায়বিচার প্রশাসনের স্বার্থে উচ্চতর আদালতের প্রতিটি আদেশ তার প্রকৃত অর্থ ও কার্যকারিতা অনুযায়ী পালন করতে হবে। কোনো বিচারিক আদেশ মেনে চলা ইচ্ছাধীন বিষয় নয়; এটি আইনের শাসনের একটি অপরিহার্য অংশ। কোনো আদেশে নির্দিষ্ট কোনো কাজের অনুমতি থাকলে এমন ব্যাখ্যা গ্রহণ করা যাবে না, যার ফলে তার বিপরীত ফল সৃষ্টি হয়।

একই সঙ্গে হাইকোর্ট উল্লেখ করেন, অন্তর্বর্তীকালীন আবেদন, বিশেষ করে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার আবেদন, সাধারণত জরুরি প্রকৃতির। এসব আবেদনের নিষ্পত্তিতে অযথা বিলম্ব হলে পক্ষগুলোর অপ্রয়োজনীয় ক্ষতি হতে পারে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে মূল মামলার কার্যক্রমই নিষ্ফল হয়ে যেতে পারে। এ বিষয়ে দেওয়ানি মামলা পরিচালনার ব্যবহারিক নির্দেশিকার ২০ নম্বর অনুচ্ছেদের নির্দেশনার কথাও রায়ে উল্লেখ করা হয়।

রায়ে সিটি ব্যাংক লিমিটেডসহ সংশ্লিষ্টদের ১৪ জানুয়ারি ২০২৪ থেকে রায়ের তারিখ পর্যন্ত বিবাদী নং ১-এর প্রাপ্য মোট নগদ লভ্যাংশের পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রস্তুতের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে কত টাকা পরিশোধ করা হয়েছে এবং কত টাকা বকেয়া রয়েছে, তা পৃথকভাবে উল্লেখ করতে বলা হয়। পরিশোধযোগ্য অবশিষ্ট লভ্যাংশ কোনো অযথা বাধা, হয়রানি বা অপ্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে রেজিস্ট্রার জেনারেলের কাছে হলফনামার মাধ্যমে প্রতিপালন প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়।

এ ছাড়া ঢাকার প্রথম যুগ্ম জেলা জজকে ১২ নভেম্বর ২০২৩ তারিখে দায়ের করা অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার আবেদনটি রায়ের কপি পাওয়ার ১০ কার্যদিবসের মধ্যে নিষ্পত্তির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আদালতকে মামলার উপকরণের ভিত্তিতে স্বাধীনভাবে ও আইন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে এবং অপ্রয়োজনীয় মুলতবি না দিতে বলা হয়েছে।

এসব পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশনার মাধ্যমে হাইকোর্ট বিধি নিষ্পত্তি করেন। মামলায় কোনো খরচের আদেশ দেওয়া হয়নি।


বিডিএলপিবি/মাসুম


শেয়ার করুন

0 coment rios: