২৪ সেপ, ২০২৬

যৌতুকের দাবিতে স্ত্রী হত্যা: মৃত্যুদণ্ডের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদানের রায়ে যে পর্যবেক্ষণ দিলেন হাইকোর্ট

ছবিঃ সংগৃহীত 
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ যৌতুকের দাবিতে স্ত্রীকে হত্যার দায়ে দণ্ডিত মো. সুরজ আলীর মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন। আদালত বলেছেন, নিহতের মরদেহ স্বামীর বাড়িতে পাওয়া যাওয়া, চিকিৎসা-প্রমাণে শ্বাসরোধজনিত হত্যার বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত হওয়া এবং যৌতুক দাবির পক্ষে সাক্ষ্য আসামির অপরাধ প্রমাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে দীর্ঘ কারাবাস ও অন্যান্য প্রশমনকারী পরিস্থিতি বিবেচনায় মৃত্যুদণ্ড পরিবর্তন করা হয়েছে।

বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে. এম. রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বিভাগের বেঞ্চ ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে এ রায় দেন।

মামলার প্রেক্ষাপটঃ

মামলার বিবরণ অনুযায়ী, নিহত চম্পা খাতুনের সঙ্গে আসামি মো. সুরজ আলীর প্রায় ১৫ বছর আগে বিয়ে হয়। বিয়ের সময় ৫০ হাজার টাকা যৌতুক দাবি করা হলে নিহতের পরিবার ৩০ হাজার টাকা পরিশোধ করে। পরবর্তীতে বাকি ২০ হাজার টাকা আদায়ের জন্য চম্পাকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে।

একপর্যায়ে স্থানীয় চেয়ারম্যানের উপস্থিতিতে সালিশ অনুষ্ঠিত হয় এবং বাকি ২০ হাজার টাকা পরিশোধ করা হয়। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, এরপরও আসামিপক্ষ পুনরায় ২০ হাজার টাকা যৌতুক দাবি করে। ওই টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে চম্পাকে হত্যা করা হয় এবং তাঁর মরদেহ স্বামীর বাড়ির আঙিনায় কাঁঠালগাছের নিচে ফেলে রাখা হয়।

ঘটনার খবর পেয়ে নিহতের স্বজনেরা সেখানে গিয়ে মরদেহ দেখতে পান। পরে নিহতের ভাই মো. ইদ্রিস আলী ২১ মার্চ ২০০৪ তারিখে হরিণাকুণ্ডু থানায় মামলা করেন।

মামলার তদন্ত শেষে পুলিশ চারজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করে। বিচার শেষে ঝিনাইদহ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল মো. সুরজ আলীকে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ১১(ক) ধারায় দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেন। অন্য তিন আসামিকে খালাস দেওয়া হয়।

পরবর্তীতে মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে পাঠানো হয়। একই সঙ্গে আসামি ফৌজদারি আপিল ও জেল আপিল করেন।

আদালতের পর্যবেক্ষণঃ

চিকিৎসা-প্রমাণে আত্মহত্যার দাবি সমর্থিত নয়-

হাইকোর্ট বলেন, নিহতের মরদেহ আসামির বাড়িতে পাওয়া যাওয়ার বিষয়টি আসামিপক্ষ অস্বীকার করেনি। ময়নাতদন্তে নিহতের নাক ও গলায় আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়। পরবর্তী ভিসেরা পরীক্ষায় বিষের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি।

চিকিৎসক চূড়ান্ত মতামতে জানান, নাক ও মুখ বন্ধ করে শ্বাসরোধের ফলে শ্বাসকষ্টে নিহতের মৃত্যু হয়েছে এবং তা হত্যাজনিত। আদালত চিকিৎসকের বিশেষজ্ঞ মতামত গ্রহণযোগ্য বিবেচনা করে বলেন, আত্মহত্যার বিষয়ে আসামিপক্ষের বক্তব্য চিকিৎসা-প্রমাণে সমর্থিত হয়নি।

স্ত্রীর মৃত্যুর কারণ ব্যাখ্যার দায়-

আদালতের পর্যবেক্ষণ, নিহতের মরদেহ স্বামীর বাড়িতে পাওয়া যাওয়ার পর তাঁর মৃত্যুর কারণ ব্যাখ্যা করার দায় আসামির ওপর বিশেষভাবে বর্তায়। এ মামলায় আসামি কখনো বিষপানে, আবার কখনো ফাঁসিতে আত্মহত্যার কথা বললেও সেই দাবির পক্ষে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ দিতে পারেননি।

আলিবাইয়ের দাবি প্রমাণিত হয়নি-

আসামিপক্ষের দাবি ছিল, ঘটনার রাতে সুরজ আলী বাড়িতে ছিলেন না। তবে এ বিষয়ে প্রতিরক্ষা সাক্ষী এমন কোনো প্রত্যক্ষ তথ্য দিতে পারেননি, যা থেকে প্রমাণ হয় যে আসামি ঘটনার সময় অন্য কোথাও অবস্থান করছিলেন।

হাইকোর্ট বলেন, আলিবাইয়ের দাবি সুনির্দিষ্ট ও আইনানুগ প্রমাণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করতে হয়। এ মামলায় আসামির উপস্থাপিত সাক্ষ্য তাঁর অনুপস্থিতির দাবি প্রমাণে সহায়ক হয়নি।

পুনরায় যৌতুক দাবির অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত-

আদালত বলেন, নিহতের ভাই, বাবা ও দুই চাচাতো ভাইয়ের সাক্ষ্যে বিয়ের সময় যৌতুক প্রদান, পরবর্তী সালিশ এবং পুনরায় ২০ হাজার টাকা দাবির বিষয়টি উঠে এসেছে।

বিশেষ করে নিহতের বাবা সাক্ষ্যে জানান, আসামি সরাসরি তাঁর কাছে আরও ২০ হাজার টাকা যৌতুক দাবি করেছিলেন। আদালতের মতে, জেরায় এ বক্তব্য নড়বড়ে হয়নি।

আদালত আরও পর্যবেক্ষণ করেন, বিয়ের সময় দাবিকৃত ৫০ হাজার টাকা নিয়ে বিরোধ সালিশের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হলেও পরবর্তী ২০ হাজার টাকা দাবির অভিযোগ পৃথকভাবে প্রমাণিত হয়েছে। ফলে যৌতুকের দাবিতে হত্যার অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

দীর্ঘ কারাবাস ও আইন সংশোধন বিবেচনায় সাজা পরিবর্তনঃ

হাইকোর্ট উল্লেখ করেন, আসামি দীর্ঘ সময় কারাগারে ছিলেন এবং সাত বছরের বেশি সময় কনডেম সেলে কাটিয়েছেন। আদালত তাঁর দীর্ঘ কারাবাস, অপরাধের প্রকৃতি এবং অন্যান্য প্রশমনকারী পরিস্থিতি বিবেচনা করেন।

এ ক্ষেত্রে Nalu vs. The State, 17 BLC (AD) 204 মামলার নজির উল্লেখ করা হয়। আদালত আরও বলেন, ২৫ মার্চ ২০২৫ তারিখে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ১১(ক) ধারায় সংশোধন আনা হয়েছে। ডেথ রেফারেন্স ও আপিল বিচারাধীন থাকায় সংশোধিত বিধান এ মামলায় প্রযোজ্য হবে।

এসব বিষয় বিবেচনায় আদালত মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

হাইকোর্টের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তঃ

হাইকোর্ট বিভাগ ডেথ রেফারেন্স খারিজ এবং ফৌজদারি আপিল খারিজ করেন। তবে আসামির মৃত্যুদণ্ড পরিবর্তন করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও ট্রাইব্যুনাল নির্ধারিত অর্থদণ্ড বহাল রাখেন।

একই সঙ্গে ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৫এ ধারার সুবিধা অনুযায়ী কারাবাসের সময় গণনার নির্দেশ দেন এবং আসামিকে কনডেম সেল থেকে সাধারণ বন্দিদের জন্য নির্ধারিত সেলে স্থানান্তরের আদেশ দেন। জেল আপিলও নিষ্পত্তি করা হয়।

আইনি শিক্ষাঃ

এ রায়ে আদালত দেখিয়েছেন, হত্যার অভিযোগে চিকিৎসা-প্রমাণ, প্রত্যক্ষ ও পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য এবং আসামির ব্যাখ্যা মূল্যায়ন করে অপরাধ নির্ধারণ করা হয়। একই সঙ্গে অপরাধ প্রমাণিত হলেও সাজা নির্ধারণের সময় আইন সংশোধন, কারাবাসের সময়কাল ও প্রশমনকারী পরিস্থিতি বিবেচনায় আসতে পারে।

সূত্র: Death Reference No. 43 of 2019; Criminal Appeal No. 5809 of 2019; Jail Appeal No. 133 of 2022। রায়: ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬। লিখিত রায় প্রকাশ: ২৩.০৯.২০২৬।


বিডিএলপিবি/মাসুম


শেয়ার করুন

0 coment rios: