১৩ সেপ, ২০২৬

জোরপূর্বক পদত্যাগ পত্রের আইনি বৈধতা নেই : হাইকোর্টের রায়

ফাইল ছবি
কোনো শিক্ষকের কাছ থেকে জোর করে নেওয়া পদত্যাগপত্রের আইনগত কোনো বৈধতা নেই বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে জোরপূর্বক পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর নেওয়া শিক্ষককে অবিলম্বে স্বপদে পুনর্বহালের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। ‘মো. আলকাছ উদ্দিন আহমেদ বনাম রাষ্ট্র’ মামলায় হাইকোর্ট এ রায় দেন।

গাজীপুরের কালিয়াকৈরের গোলাম নবী মডেল পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আলকাছ উদ্দিন আহমেদকে জোরপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে করা রিটের চূড়ান্ত শুনানি শেষে বিচারপতি মো. ইকবাল কবির ও বিচারপতি এস এম সাইফুল ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ গত ২০ আগস্ট রুল নিষ্পত্তি করে এ রায় দেন। সম্প্রতি রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করা হয়েছে।

হাইকোর্টের রায়ে বলা হয়েছে, আদালতের নির্দেশনা অমান্য করলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়া, পর্ষদের সভাপতিকে অপসারণ এবং প্রতিষ্ঠানের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের এমপিও বন্ধের মতো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।

রায়ে আদালত বলেন, রিটকারীর পদত্যাগপত্র স্বেচ্ছায় বা নিজের ইচ্ছায় দেওয়া হয়নি; বরং তার স্বাক্ষর জোরপূর্বক নেওয়া হয়েছিল। এ ধরনের পদত্যাগের কোনো আইনগত বৈধতা নেই। আইন বা বিধিও জোরপূর্বক কিংবা চাপের মুখে নেওয়া পদত্যাগকে সমর্থন করে না।

মামলার প্রেক্ষাপট: মামলার বিবরণ থেকে জানা যায়, মো. আলকাছ উদ্দিন আহমেদ গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার গোলাম নবী মডেল পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট একদল দুষ্কৃতকারী তার অনিচ্ছা সত্ত্বেও জোরপূর্বক একটি পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর নেয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।

এর পরদিন তিনি কালিয়াকৈর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। পরে জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে লিখিতভাবে বিষয়টি জানান। একই সঙ্গে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) এবং ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানের কাছেও আইনি প্রতিকার ও হস্তক্ষেপ চেয়ে আবেদন করেন।

এ ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আলকাছ উদ্দিন আহমেদকে স্বপদে বহাল করার নির্দেশ দেয় ঢাকা শিক্ষা বোর্ড। তবে সেই নির্দেশ যথাযথভাবে বাস্তবায়ন না হওয়ায় প্রতিকার চেয়ে ২০২৪ সালে হাইকোর্টে রিট করেন তিনি।

রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে একই বছর রুল জারি করেন হাইকোর্ট। পাশাপাশি জোর করে নেওয়া পদত্যাগপত্রের কার্যকারিতা তিন মাসের জন্য স্থগিত করেন আদালত। পরে গত ২০ আগস্ট রুল নিষ্পত্তি করে চূড়ান্ত রায় দেন হাইকোর্ট।

হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ: রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, রিট আবেদনকারীর পদত্যাগের কোনো আইনগত বৈধতা ছিল না। তিনি ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত এমপিওর মাধ্যমে বেতন-ভাতা পেয়ে আসছিলেন। এ অবস্থায় বিদ্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদ তাকে প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন ও চাকরিতে বহাল রাখতে আইনিভাবে বাধ্য ছিল। ফলে তিনি অবিলম্বে পুনর্বহালের অধিকারী।

আদালত আরও বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ হিসেবে শিক্ষা বোর্ডের এখতিয়ার রয়েছে ম্যানেজিং কমিটির প্রস্তাবিত যেকোনো শৃঙ্খলামূলক বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা পর্যালোচনা, অনুমোদন, সংশোধন বা বাতিল করার। প্রয়োজনে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতাও বোর্ডের রয়েছে।

তাই শিক্ষা বোর্ডের পক্ষ থেকে ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ও বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের প্রতি জারি করা নির্দেশনা তাদের জন্য বাধ্যতামূলক ছিল। এসব নির্দেশনা ইচ্ছাকৃতভাবে পালন না করা অসদুপায়, স্বেচ্ছাচারিতা ও ক্ষমতার অপব্যবহারের শামিল বলেও মন্তব্য করেন আদালত।

হাইকোর্ট বলেন, শিক্ষা বোর্ডের নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে সংশ্লিষ্টরা আইনগতভাবে বাধ্য। তাদের নিষ্ক্রিয়তা, প্রশাসনিক অবহেলা এবং সংবিধিবদ্ধ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা রিটকারীর বৈধ অধিকার লঙ্ঘনের শামিল।

আদালত সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেন, বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির মাধ্যমে রিট আবেদনকারীকে স্বপদে পুনর্বহাল নিশ্চিত করতে হবে। এ নির্দেশনা পালনে ব্যর্থ হলে শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান ও মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক নির্দেশনা অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারবেন।

এর মধ্যে ম্যানেজিং কমিটি বাতিল, কমিটির সভাপতিকে অপসারণ এবং প্রতিষ্ঠানের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের এমপিও বন্ধের মতো ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশও থাকতে পারে বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে।


বিডিএলপিবি/এমএম


শেয়ার করুন

0 coment rios: