 |
| শুধু ক্রয়সূত্রে বা বিনিময়সূত্রে জমির সহ-অংশীদার হলে প্রি-এম্পশন অধিকার প্রযোজ্য নয়; জেলা জজের রিভিশন এখতিয়ার নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ |
জমি প্রি-এম্পশন বা অগ্রক্রয় অধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রে উত্তরাধিকারসূত্রে সংশ্লিষ্ট হোল্ডিংয়ের সহ-অংশীদার হওয়া আইনগতভাবে অপরিহার্য বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০-এর ৯৬ ধারার অধীনে শুধু ক্রয়সূত্রে বা বিনিময়সূত্রে সহ-অংশীদার হওয়া ব্যক্তি প্রি-এম্পশনের আবেদন করতে পারেন না। একই সঙ্গে যে আদেশের বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ রয়েছে, তার বিরুদ্ধে রিভিশন গ্রহণ করা হলে তা এখতিয়ারবহির্ভূত হতে পারে।
সম্প্রতি সিভিল রিভিশন নং- ৬৩৩/২০০৯, আবদুর রশিদ পাটোয়ারী ও অন্যান্য বনাম মোছা. রাইহানা বেগম ও অন্যান্য মামলায় বিচারপতি রেজাউল করিম এ গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত দেন। ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ তারিখে শুনানি শেষে ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ তারিখে রায় ঘোষণা করা হয়। রায়টি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয় ১২ অক্টোবর, ২০২৬ তারিখে। রায়ে লক্ষ্মীপুরের জেলা জজের ২০০৯ সালের আদেশ বাতিল করে রামগঞ্জের সহকারী জজের পূর্ববর্তী আদেশ পুনর্বহাল করা হয়েছে।
মামলার ঘটনা
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ২০০৭ সালের ১৮ এপ্রিল নিবন্ধিত বিনিময় দলিলের মাধ্যমে ২৪ শতাংশ জমি আবদুর রশিদ পাটোয়ারীর কাছে হস্তান্তর করা হয়। ওই জমি প্রি-এম্পশনের দাবিতে ২০০৭ সালের ১৭ জুন সহকারী জজ আদালত, রামগঞ্জ, লক্ষ্মীপুরে বিবাদী পক্ষের রাইহানা বেগম একটি মিসলেনিয়াস মামলা দায়ের করেন।
রাইহানা বেগমের দাবি ছিল, ১৯৯৬ ও ১৯৯৮ সালের দুটি নিবন্ধিত সাফকবলা দলিল এবং ২০০২ সালের একটি বিনিময় দলিলের মাধ্যমে তিনি সংশ্লিষ্ট হোল্ডিংয়ের সহ-অংশীদার হয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, প্রকৃতপক্ষে জমিটি বিক্রি করা হলেও প্রি-এম্পশনের অধিকার এড়াতে বিনিময় দলিলের আশ্রয় নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, জমির গ্রহীতা আবদুর রশিদ পাটোয়ারীর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, দলিলটি প্রকৃত বিনিময় দলিল এবং ২০০৬ সালে সংশোধিত রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের ৯৬ ধারা অনুযায়ী উত্তরাধিকারসূত্রে সহ-অংশীদার না হলে প্রি-এম্পশনের আবেদন করা যায় না।
নিম্ন আদালতের আদেশ ও জেলা জজের সিদ্ধান্ত
২০০৮ সালের ১৪ জানুয়ারি আবদুর রশিদ পাটোয়ারী দেওয়ানি কার্যবিধির Order VII, Rule 11 অনুযায়ী আবেদন দাখিল করে প্রি-এম্পশনের মামলাটি খারিজের আবেদন জানান।
সহকারী জজ ২০০৮ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি আবেদনটি মঞ্জুর করে প্রি-এম্পশনের মামলা খারিজ করেন। আদালতের পর্যবেক্ষণ ছিল, আবেদনকারী নিজেকে ক্রয়সূত্রে ও বিনিময়সূত্রে সহ-অংশীদার হিসেবে দাবি করেছেন; কিন্তু সংশোধিত আইনের বিধান অনুযায়ী প্রি-এম্পশনের জন্য উত্তরাধিকারসূত্রে সহ-অংশীদার হওয়া আবশ্যক।
পরবর্তীতে রাইহানা বেগম লক্ষ্মীপুরের জেলা জজ আদালতে Civil Revision No. 4 of 2008 দায়ের করেন। জেলা জজ ২০০৯ সালের ২৮ জানুয়ারি সহকারী জজের আদেশ বাতিল করে মামলাটি আইন অনুযায়ী নিষ্পত্তির নির্দেশ দেন। এ আদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিভিশন দায়ের করেন আবদুর রশিদ পাটোয়ারী ও অন্যান্যরা।
হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ
হাইকোর্ট বলেন, ২০০৬ সালের সংশোধনীর মাধ্যমে প্রতিস্থাপিত রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের ৯৬(১) ধারায় প্রি-এম্পশনের অধিকার সীমিত করা হয়েছে। এ ধারার প্রথম শর্তাংশ অনুযায়ী, কোনো রায়তের হোল্ডিংয়ের অংশ বা শেয়ার এমন ব্যক্তির কাছে বিক্রি হতে হবে, যিনি ওই হোল্ডিংয়ের সহ-অংশীদার প্রজা নন। পাশাপাশি ধারাটির প্রথম শর্তে বলা হয়েছে, আবেদনকারীকে অবশ্যই উত্তরাধিকারসূত্রে ওই হোল্ডিংয়ের সহ-অংশীদার হতে হবে।
আদালত আরও বলেন, দেওয়ানি কার্যবিধির Order VII, Rule 11(d) অনুযায়ী মামলা খারিজের আবেদন বিবেচনার সময় আরজিতে বর্ণিত বক্তব্যকে সত্য ধরে আইনগত বাধা রয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করতে হয়। রাইহানা বেগমের নিজের আবেদনে তিনি ক্রয় ও বিনিময়ের মাধ্যমে সহ-অংশীদার হওয়ার কথা বলেছেন; উত্তরাধিকারসূত্রে সহ-অংশীদার হওয়ার দাবি করেননি। ফলে তাঁর আবেদনে আইনগত বাধা স্পষ্ট ছিল।
বিনিময় দলিলটি প্রকৃত বিনিময়, নাকি বিক্রির ছদ্মবেশ—এটি তথ্যগত প্রশ্ন এবং Order VII, Rule 11-এর আবেদনে চূড়ান্তভাবে নির্ধারণের বিষয় নয় বলে আদালত উল্লেখ করেন। তবে দলিলটিকে বিক্রয় হিসেবে ধরে নিলেও আবেদনকারীর উত্তরাধিকারসূত্রে সহ-অংশীদার না হওয়ার বিষয়টি প্রি-এম্পশনের আবেদনের ক্ষেত্রে স্বতন্ত্র আইনগত বাধা হিসেবে থেকে যায়।
আপিলযোগ্য আদেশের বিরুদ্ধে রিভিশন গ্রহণে এখতিয়ারগত বাধা
হাইকোর্টের রায়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, লক্ষ্মীপুরের জেলা জজের কাছে দায়ের করা রিভিশন আবেদনটিই আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য ছিল না।
আদালত ব্যাখ্যা করেন, প্রি-এম্পশনের আবেদন খারিজের আদেশটি আপিলযোগ্য ছিল। দেওয়ানি কার্যবিধির ২(২) ধারায় আরজি খারিজকে ডিক্রির অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং ৯৬(১) ধারায় ডিক্রির বিরুদ্ধে আপিলের বিধান রয়েছে। এ ছাড়া রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের ৯৬(১৫) ধারায় ওই ধারার অধীনে আদালতের আদেশের বিরুদ্ধে সাধারণ দেওয়ানি আপিল আদালতে আপিলের সুযোগ রয়েছে।
তাই দেওয়ানি কার্যবিধির ১১৫(২) ধারার অধীনে জেলা জজের রিভিশন এখতিয়ার প্রয়োগের সুযোগ ছিল না। হাইকোর্ট বলেন, জেলা জজ আপিলযোগ্য আদেশের বিরুদ্ধে রিভিশন গ্রহণ করে সহকারী জজের আদেশ বাতিল করে এখতিয়ারবহির্ভূত কাজ করেছেন।
হাইকোর্টের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
হাইকোর্ট দুটি স্বতন্ত্র কারণে রুল যথাযথ ঘোষণা করেন। প্রথমত, জেলা জজ এমন একটি রিভিশন গ্রহণ ও মঞ্জুর করেছেন, যা আইন অনুযায়ী গ্রহণযোগ্য ছিল না। দ্বিতীয়ত, সংশোধিত ৯৬(১) ধারার প্রথম শর্তে উত্তরাধিকারসূত্রে সহ-অংশীদার হওয়ার বাধ্যবাধকতা বিবেচনা না করেই তিনি সহকারী জজের আইনসম্মত আদেশ বাতিল করেছিলেন।
ফলে হাইকোর্ট লক্ষ্মীপুরের জেলা জজের ২০০৯ সালের ২৮ জানুয়ারির আদেশ বাতিল করেন এবং রামগঞ্জের সহকারী জজের ২০০৮ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারির আদেশ পুনর্বহাল করেন। আদালত স্পষ্ট করেন, প্রি-এম্পশনের আবেদনে জমার শর্তসংক্রান্ত প্রশ্নটি তাঁরা নিষ্পত্তি করেননি, কারণ নিম্ন আদালত এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেননি।
আইনগত তাৎপর্য: রায়টি প্রি-এম্পশন অধিকার প্রয়োগে উত্তরাধিকারসূত্রে সহ-অংশীদার হওয়ার শর্ত এবং আপিলযোগ্য আদেশের বিরুদ্ধে রিভিশন দায়েরের সীমাবদ্ধতা—উভয় ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা প্রদান করে।
বিডি ল' পোস্ট/মাসুম