১৭ জুল, ২০২৬

গণঅভ্যুত্থানের বৈধতা-অবৈধতার বিচার আদালতের বিষয় নয়, এ প্রশ্নে জনগণই সর্বোচ্চ বিচারক: শিশির মনির

ছবি: সংগৃহীত 

গণঅভ্যুত্থানের বৈধতা-অবৈধতার প্রশ্নে জনগণই সর্বোচ্চ বিচারক বলে মন্তব্য করেছেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির। বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) দুপুরে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সমিতি ভবনের মিলনায়তনে ‘সংবিধান সংশোধন কমিটি, গণভোট, জুলাই সনদ ও পঞ্চদশ সংশোধনী মামলার রায়: বর্তমান বাস্তবতা ও গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ ল'ইয়ার্স কাউন্সিল এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে।

শিশির মনির বলেন, গণঅভ্যুত্থানের বৈধতা বা অবৈধতার বিচার আদালতের বিষয় নয়। এক্ষেত্রে জনগণই সর্বোচ্চ বিচারক। ফলে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশই জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা ও অভিপ্রায় প্রকাশের একমাত্র আইনগত মাধ্যম।

তিনি আরও বলেন, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে পাতানো নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করা হয়েছে। এতে একনায়কতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হয়। ন্যায়বিচার, আইনের শাসন ও মানবাধিকারও ভূলুণ্ঠিত করে বিচারালয়কে রাজনৈতিক উদ্দেশে ব্যবহার করা হয়েছে। গুম-খুন, নির্যাতন ও আয়নাঘর ছিল নিত্যদিনের বাস্তবতা। এছাড়া একনায়কতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাকে সুদৃঢ় করতে সংবিধানে পঞ্চদশ সংশোধনী যুক্ত করা হয়েছে। এই সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধান পুনর্লিখিত হয়। বিলুপ্ত করা হয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা। গণভোটের ব্যবস্থাও বিলুপ্ত করা হয়।

তিনি বলেন, বছরের পর বছর ক্ষমতার চরম অপব্যবহারে মানুষের মনে হতাশা ও গভীর ক্ষোভের জন্ম হয়। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে বিস্ফোরিত হয় দীর্ঘদিনের সেই চাপা ক্ষোভ। গঠিত হয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে বিচার, সংস্কার ও নির্বাচন নিয়ে পথ চলতে শুরু করে এ সরকার। এর মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন হলেও বিচারপ্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রসংস্কার এখনও অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে।

শিশির মনির বলেন, ২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বর জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতাবলে 'জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ- ২০২৫' জারি করেন রাষ্ট্রপতি। এর মাধ্যমে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের পূর্ণাঙ্গ রোডম্যাপ নির্ধারণ করা হয়। আদেশের ৩ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগের উদ্দেশে এই আদেশ এবং জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত অংশ গণভোটে উপস্থাপন করা হবে। ‘হ্যাঁ’ ভোট বিজয়ী হলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারসহ অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই জাতীয় সনদে বর্ণিত পদ্ধতিতে গঠিত হবে। একই সঙ্গে জাতীয় সংসদ হবে দ্বি-কক্ষের ও উচ্চকক্ষে থাকবে ১০০ জন সদস্য। ৭ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী গণভোটে 'হ্যাঁ' ভোট বিজয়ী হলে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি 'সংবিধান সংস্কার পরিষদ' গঠন করা হবে। এই পরিষদ প্রথম অধিবেশন থেকে পরবর্তী ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কারের কাজ সম্পন্ন করবে।

তিনি আরও বলেন, সংশোধিত চূড়ান্ত ফলাফল অনুযায়ী ১২ ফেব্রুয়ারি গণভোটে ভোটদানের হার ছিল ৬০ দশমিক ২৬ শতাংশ। ১৭ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ীদের সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ পড়ানো হয়। একই অনুষ্ঠানে তাদের সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার কথা ছিল। বিরোধী দলীয় জোটের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা দ্বৈত শপথ নিলেও সরকার দলীয় নির্বাচিতরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিতে অস্বীকৃতি জানান। এর মাধ্যমে জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ- ২০২৫-এর বিধান লঙ্ঘন করেন তারা। সম্প্রতি পঞ্চদশ সংশোধনী মামলার রায় ঘোষণা করেন দেশের সর্বোচ্চ আদালত।

‘গণঅভ্যুত্থানের পর এই সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারের করা রিট শুনানি শেষে ২০২৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ও গণভোট সংক্রান্ত বিধান ফিরিয়ে আনার আদেশ দেন হাইকোর্ট বিভাগ। ওই রায়ের বিরুদ্ধে তিনটি আপিল করা হয়। গত ৯ জুলাই এসব আপিল খারিজ করে দিয়ে হাইকোর্টের রায় বহাল রাখেন আপিল বিভাগ। ফলে সংবিধানের ৭ক ও ৭খ অনুচ্ছেদ বাতিল, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ও সংবিধান সংশোধন-সংক্রান্ত গণভোটের ব্যবস্থা পুনর্বহাল এবং মৌলিক অধিকার বলবৎ করার ক্ষমতা একমাত্র হাইকোর্টের কাছেই ন্যস্ত থাকে। তবে পঞ্চদশ সংশোধনীর অবশিষ্ট বিষয়গুলো সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব জাতীয় সংসদের ওপরই ন্যস্ত থাকবে বলে পর্যবেক্ষণ দেন। এ রায়ের পর এখন সংবিধান সংস্কার এবং জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের পথ সুগম হয়েছে। অতএব গোটা জাতির প্রত্যাশা পূরণের এখনই মোক্ষম সময়।

শিশির মনির বলেন, গণঅভ্যুত্থানের আইন সংশ্লিষ্ট সবার ওপর বাধ্যকর। বাংলাদেশের কোনও আদালত এই আইনকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেনি। কারণ এই আইনই জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা ও অভিপ্রায়ের লিখিত রূপ। তাই জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ-২০২৫-এর ৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করে। আদেশে নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসরণপূর্বক সংবিধানের প্রয়োজনীয় সব সংস্কার সম্পন্ন করাই হবে আইনসম্মত ও যথাযথ পদক্ষেপ।

সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ লইয়ার্স কাউন্সিলের সভাপতি অ্যাডভোকেট জসিম উদ্দিন সরকার, সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দ, সাবেক চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ হোসেন লিপু, ব্যারিস্টার এ. এস. এম. শাহরিয়ার প্রমুখ।


বিডিএলপিবি/এমএম


শেয়ার করুন

0 coment rios: