১৩ জুল, ২০২৬

২৫ বছর পূর্ণ হবার আগে পদত্যাগ করলে মিলবে না পেনশন: আপীল বিভাগের রায়

ছবি: সংগৃহীত 

সরকারি চাকরিতে ২৫ বছর পূর্ণ করার পূর্বে যে কেউ পদত্যাগ করে, তিনি পেনশন সুবিধার অধিকারী হবেন না, মর্মে আপিল বিভাগ রায় দিয়েছেন। রায়টি ৯ জুলাই সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে ২৮ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রূপে প্রকাশ করা হয়। রায়টি লিখেছেন বিচারপতি ফারাহ মাহবুব।

এর আগে, হাইকোর্টের এক রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করেন, উক্ত আপিল মঞ্জুর করে আপিল বিভাগের বিচারপতি মো. রেজাউল হক, বিচারপতি এস এম এমদাদুল হক এবং বিচারপতি ফারাহ মাহবুবের সমন্বয়ে যে রায়টি হয়েছে, তা ১১ মার্চ প্রকাশিত হয়।

রাষ্ট্রপক্ষে আদালতে শুনানিতে অংশগ্রহণ করেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ আরশাদুর রউফ এবং অনীক আর হক। তাদের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ। এছাড়া, রিট আবেদনের পক্ষে শুনানিতে অংশগ্রহণ করেন রিটকারী মাহবুব মোরশেদ নিজে।

রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে, আইনসভা প্রজ্ঞা ও যৌক্তিক বিবেচনার উপর ভিত্তি করেই এমন বিধান তৈরি করা হয়েছে যে ২৫ বছরের চাকরির টাইম লাইনে পূর্ণ হওয়ার পূর্বে যদি কোনো সরকারি কর্মচারী পদত্যাগ করেন, তাহলে তিনি কোনো সুবিধার অধিকারী হবেন না।

মামলার ফ্যাক্ট: মাহবুব মোরশেদ ১৯৯১ সালে সহকারী বিচারক হিসেবে জুডিশিয়াল সার্ভিসে যোগ দেন। ১৯ বছর সার্ভিস করে ২০১১ সালের ৩১ জানুয়ারি তিনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন, তখন তিনি অতিরিক্ত জেলা জজ ছিলেন। সার্ভিসে ১৯ বছর পূর্ণ হওয়ার পরে ৬১ শতাংশ পেনশন ও আনুতোষিকের জন্য ২০১৫ সালে আইন মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেন তিনি।

এরপর, প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে ২০১৫ সালের ২৫ মার্চ আইন মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠিতে জানানো হয়, সরকারি চাকরিতে পদত্যাগ করলে পূর্ববর্তী চাকরিকাল আইনগতভাবে বাজেয়াপ্ত হবে। অর্থাৎ, পেনশনের জন্য সেটি গণনা করা হবে না (বিএসআর প্রথম খণ্ডের বিধি-৩০০ সেকশন-৩)। মাহবুব মোরশেদের চাকরিকাল ২৫ বছর পূর্ণ হয়নি, এবং তিনি ২৫ বছর পূর্তি সাপেক্ষে সংশ্লিষ্ট বিধানের আলোকে পেনশনের জন্য কোনো আবেদন করেননি, সুতরাং তিনি পেনশনপ্রাপ্ত নন (১৯৭৪ সালের গণকর্মচারী অবসর আইনের ৯ ধারা অনুযায়ী)।

এ অবস্থায়, বিধি-৩০০ এবং ওই চিঠির বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে মাহবুব মোরশেদ ২০১৬ সালে রিট করেন। চূড়ান্ত শুনানির পর, হাইকোর্ট ২০২১ সালের ১৮ মার্চ রায় দেন, এবং এতে ২০১৫ সালের ২৫ মার্চের ওই চিঠিকে আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হয়। একইসাথে, রায়ের অনুলিপি পাওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে, চাকরির মেয়াদ অনুসারে মাহবুব মোরশেদের পেনশনসহ অন্যান্য বকেয়া সুবিধার গণনা ও মঞ্জুর করতে নির্দেশ দেয়া হয়।

এই রায়ের বিরোধিতায় রাষ্ট্রপক্ষ লিভ টু আপিল (আপিল করার অনুমতি চেয়ে আবেদন) করে। ২০২২ সালের ২৪ অক্টোবর লিভ টু আপিল মঞ্জুর করে আপিল বিভাগ, এবং সেইসাথে হাইকোর্টের রায়ের স্থগিতাদেশ চলমান রাখে। এর ধারাবাহিকতায়, রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করে। রাষ্ট্রপক্ষের করা ওই আপিল মঞ্জুর করে হাইকোর্টের দেওয়া রায়টি বাতিল করে গত ১১ মার্চ আপিল বিভাগ রায় দেন।

আপিল বিভাগের রায়ের পুনশ্চ: BSR-এর ৩০০(এ) বিধির পদত্যাগ সংক্রান্ত অংশটি সম্পূর্ণ সাংবিধানিক এবং বৈধ। ফলস্বরূপ, রাষ্ট্রপক্ষের আপিলটি মঞ্জুর করা হয় এবং হাইকোর্ট বিভাগের ১৮.০৩.২০২১ তারিখের রায় ও আদেশটি সম্পূর্ণ বাতিল (Set aside) করা হয়।

রায়ের পক্ষে আপিল বিভাগের যুক্তি: আদালত BSR-এর ৩০০(এ) বিধির উদ্ধৃতি দিয়ে বলে যে, পদত্যাগের ফলে অতীতের সমস্ত চাকরিকাল বাজেয়াপ্ত হয়। 'পেনশন' ধারণার ব্যাখ্যা দিয়ে আদালত বলে, এটি সন্তোষজনকভাবে নির্দিষ্ট চাকরিকাল সম্পন্ন করার পর অর্জিত হয়। আদালত ভারতের সুপ্রিম কোর্টের নজির (UCO Bank case) টেনে 'পদত্যাগ' (Resignation) এবং 'অবসর' (Retirement)-এর মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট করে। পদত্যাগ হলো মালিক-শ্রমিক সম্পর্কের সম্পূর্ণ অবসান, আর অবসর হলো বিধিবদ্ধ নিয়ম অনুযায়ী নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে সম্পর্কের সমাপ্তি।

আদালত দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করে যে, পদত্যাগ কোনো 'শাস্তি' (Punishment) নয়। অসদাচরণের জন্য চাকরিচ্যুতি ও পদত্যাগ এক বিষয় নয়। ৩০০(এ) বিধিতে এই শব্দগুলো একসাথে ব্যবহৃত হলেও তাদের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। তাই এখানে সংবিধানের ২৭ বা ৩১ অনুচ্ছেদ লঙ্ঘনের বা বৈষম্যের কোনো সুযোগ নেই।

এছাড়া এ সংক্রান্ত অর্থমন্ত্রব্যাখ্যায় স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, ৫-২৪ বছরের পেনশন কেবল তখনই প্রাপ্য হবে যদি: (১) সরকারি কর্মচারী মৃত্যুবরণ করেন বা মেডিকেল বোর্ড দ্বারা স্থায়ীভাবে অক্ষম ঘোষিত হন, অথবা (২) স্থায়ী পদ বিলুপ্তির কারণে চাকরি থেকে ছাঁটাই হন। যেহেতু এই শর্তগুলোর মধ্যে 'পদত্যাগ' অন্তর্ভুক্ত নেই, তাই আপিল বিভাগ সিদ্ধান্ত নেয় যে, হাইকোর্ট বিভাগ প্রজ্ঞাপনের মূল শর্ত বা 'ব্যাখ্যা' উপেক্ষা করে শুধু টেবিল দেখে রায় দিয়ে আইনি ভুল করেছে।


বিডিএলপিবি/এমএম


শেয়ার করুন

0 coment rios: