৭ মে, ২০২৬

ধর্ষণ মামলায় ফাঁসানো হয় ইমামকে, ভুক্তভোগীর সন্তানের ডিএনএ টেস্টে মিলল ভয়াবহ সত্য


ছবি: সংগৃহীত 

‎ফেনীর পরশুরামে কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়ে এক মাস দুই দিন কারাভোগ করা মসজিদের এক ইমাম অবশেষে ডিএনএ পরীক্ষায় নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন। তদন্তে বেরিয়ে এসেছে কিশোরীর ভূমিষ্ঠ সন্তানের জৈবিক (বায়োলজিক্যাল) পিতা তার আপন বড় ভাই। ভাইকে বাঁচাতে পরিকল্পিতভাবে ওই ইমামকে ধর্ষণ মামলায় ফাঁসানো হয়েছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, জেলার পরশুরাম উপজেলার বক্সমাহমুদ ইউনিয়নের উত্তর টেটেশ্বর গ্রামের এক কিশোরী (১৪) ২০১৯ সালে স্থানীয় মক্তবে পড়াশোনা শেষ করে। এর পাঁচ বছর পর অন্তঃসত্ত্বা হয়ে সন্তান প্রসব করলে পরিবারের পক্ষ থেকে ওই মক্তবের শিক্ষক ও স্থানীয় জামে মসজিদের ইমাম মোজাফফর আহমদের (২৫) বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ আনা হয়।

২০২৪ সালের ২৪ নভেম্বর ওই কিশোরীর মা বাদী হয়ে পরশুরাম মডেল থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেন। এ অভিযোগ মিথ্যা দাবি করে ওই বছরের ২৬ নভেম্বর মোজাফফর আহমদ ফেনীর আদালতে পাল্টা মামলা করতে গেলে আদালত প্রাঙ্গণ থেকে তাকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়। পরে ১ মাস ২ দিন কারাভোগ করে জামিনে মুক্তি পান মোজাফফর।

এ মামলার তদন্তের অংশ হিসেবে ২০২৪ সালের ২২ ডিসেম্বর অভিযুক্ত মোজাফফর আহমদ ও কিশোরীর সংরক্ষিত ভ্যাজাইনাল সোয়াব ঢাকার মালিবাগে সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়। ২০২৫ সালের ২১ জানুয়ারি প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ভ্যাজাইনাল সোয়াবে পুরুষের বীর্যের উপস্থিতি শনাক্ত হয়নি। ফলে মোজাফফরের ডিএনএর সঙ্গে তুলনামূলক মতামত দেওয়া সম্ভব হয়নি।

এরপর কিশোরী ও তার ভূমিষ্ঠ হওয়া শিশু কন্যার জৈবিক পিতা শনাক্তে নতুন করে ডিএনএ পরীক্ষার আবেদন করে পুলিশ। তদন্ত চলাকালে পুলিশ কিশোরীকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে একপর্যায়ে সে স্বীকার করে, তার আপন বড় ভাই (২২) দীর্ঘদিন ধরে তাকে ধর্ষণ করে আসছিল। বিষয়টি আড়াল করতে পরিবারের সদস্যরা স্থানীয় মসজিদের ইমাম মোজাফফরকে ফাঁসানোর চেষ্টা করেন। পরে ২০২৫ সালের ১৯ মে ওই কিশোরীর অভিযুক্ত ভাইকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠায় পুলিশ। পরদিন আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিতে আপন বোনকে ধর্ষণের কথা স্বীকার করেন তিনি।

আদালতের নির্দেশে একই বছরের ৪ আগস্ট কিশোরী, তার শিশু কন্যা এবং বড় ভাইয়ের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়। ৯ আগস্ট প্রকাশিত ডিএনএ প্রতিবেদনে নিশ্চিত করা হয়, কিশোরীর অভিযুক্ত ভাইয়ের সঙ্গে শিশুটির জৈবিক পিতা হিসেবে ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ মিল রয়েছে। একই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, কারাভোগ করা মোজাফফর আহমদ ওই শিশুর জৈবিক পিতা নন।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও পরশুরাম মডেল থানা পুলিশের উপপরিদর্শক শরীফ হোসেন অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেন, মোজাফফর আহমদের বিরুদ্ধে আনিত ধর্ষণের অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি। ফলে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০-এর ৯(১) ধারার মামলা থেকে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। অপরদিকে, ওই কিশোরীর ভাইয়ের বিরুদ্ধে একই ধারায় অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে। বর্তমানে তিনি ফেনী জেলা কারাগারে রয়েছেন।

এ প্রসঙ্গে  মোজাফফর আহমদ বলেন, আমি সম্পূর্ণ নির্দোষ হয়েও কারাভোগ করেছি। এ ঘটনায় সামাজিকভাবে অপমানিত হয়েছি, মসজিদের ইমামতি ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের চাকরি হারিয়েছি। মামলার খরচ চালাতে বাড়ির পাশে থাকা জমিও বিক্রি করতে হয়েছে। মানসিকভাবে এতটাই বিপর্যস্ত ছিলাম যে এতদিন বিষয়টি কাউকে বলতে পারিনি। এখন বিষয়টি প্রকাশ্যে আসায় মানুষ সত্য জানতে পারছে। আমি কারাভোগ, সামাজিক মর্যাদাহানি ও আর্থিক ক্ষতির ন্যায়বিচার চাই।

মোজাফফর আহমেদের আইনজীবী আবদুল আলিম মাকসুদ বলেন, তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই কাউকে দোষী আখ্যা দিলে নিরপরাধ মানুষের জীবনে কতটুকু খারাপ পরিণতি হতে পারে এ ঘটনা তারই দৃষ্টান্ত। একজন নির্দোষ ইমামকে পরিকল্পিতভাবে ফাঁসিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল। ডিএনএ পরীক্ষার মতো বৈজ্ঞানিক তদন্ত না হলে হয়তো প্রকৃত অপরাধী আড়ালেই থেকে যেত। এ ঘটনা সমাজের জন্য একটি বড় শিক্ষা।

এ ব্যাপারে পরশুরাম মডেল থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আশরাফুল ইসলাম বলেন, শুধু অভিযোগের ভিত্তিতে নয়, ডিএনএ ও তথ্যপ্রমাণের ওপর নির্ভর করেই পুলিশ শুরু থেকে মামলাটি অধিক গুরুত্ব দিয়ে কাজ করেছে। ডিএনএ পরীক্ষায় প্রকৃত সত্য সামনে আসার পর ওই ইমামের নাম চার্জশিট থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এমন ঘটনা সমাজে বিভ্রান্তি ও নেতিবাচক প্রভাব তৈরি করে।


শেয়ার করুন

0 coment rios: