বাংলাদেশের
সংবিধান বিশ্বের অন্যতম বৈচিত্র্যময় সাংবিধানিক দলিল। স্বাধীনতার পর প্রণীত ১৯৭২
সালের সংবিধান ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক নীতি হিসেবে গ্রহণ
করেছিল। কিন্তু বর্তমানে একই সংবিধানে একদিকে
ধর্মনিরপেক্ষতা মৌলিক রাষ্ট্রনীতি হিসেবে স্বীকৃত, অন্যদিকে ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম হিসেবেও সাংবিধানিক মর্যাদা ভোগ করছে। এই
দ্বৈত অবস্থান বাংলাদেশের সাংবিধানিক ইতিহাসের অন্যতম জটিল এবং বিতর্কিত
প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। প্রশ্ন হলো, একটি রাষ্ট্র
কি একই সঙ্গে ধর্মনিরপেক্ষ
এবং রাষ্ট্রধর্মবিশিষ্ট হতে পারে? নাকি
এটি সংবিধানের অভ্যন্তরে একটি মৌলিক সাংঘর্ষিক
অবস্থা?
মুক্তিযুদ্ধ,
১৯৭২ সালের সংবিধান এবং ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণা: বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম কেবল ভৌগোলিক স্বাধীনতার
আন্দোলন ছিল না; এটি
ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র এবংবৈষম্যহীন রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্য সংগ্রাম। সেই
আদর্শের প্রতিফলন ঘটে ১৯৭২ সালের
সংবিধানে।
সংবিধানের
৮(১) অনুচ্ছেদে চারটি
মৌলিক রাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করা হয় যথা
জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতা। ১২ অনুচ্ছেদে
ধর্মনিরপেক্ষতার ব্যাখ্যা দেওয়া হয়। সেখানে বলা
হয়, সাম্প্রদায়িকতা দূরীকরণ, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মের অপব্যবহার বন্ধ এবং কোনো
ধর্মকে রাজনৈতিক মর্যাদা প্রদান না করাই ধর্মনিরপেক্ষতার
মূল লক্ষ্য।
গুরুত্বপূর্ণ
বিষয় হলো, বাংলাদেশের সংবিধানে
ধর্মনিরপেক্ষতা কখনোই ধর্মবিরোধিতা হিসেবে ব্যবহৃত হয়নি। বরং এর উদ্দেশ্য
ছিল রাষ্ট্রকে ধর্মীয় পক্ষপাত থেকে মুক্ত রাখা
এবং সব ধর্মাবলম্বীর সমান
অধিকার নিশ্চিত করা।
সাংবিধানিক
পরিবর্তনের শুরুঃ ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাংলাদেশের সাংবিধানিক
দর্শনেও পরিবর্তন আসে। ১৯৭৭ সালে সামরিক শাসনামলে
সংবিধানের প্রস্তাবনায় “বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম” যুক্ত করা হয় এবং
ধর্মনিরপেক্ষতার স্থলে “আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস” সংযোজন
করা হয়। পরবর্তীতে ১৯৭৯ সালের পঞ্চম
সংশোধনী এই পরিবর্তনগুলোকে বৈধতা
প্রদান করে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসে ১৯৮৮ সালে।
অষ্টম সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে ২ক অনুচ্ছেদ সংযোজন করে ঘোষণা করা
হয়: “The state religion of the
Republic is Islam.” তবে
একই অনুচ্ছেদে অন্যান্য ধর্ম শান্তিপূর্ণভাবে পালনের
অধিকারও নিশ্চিত করা হয়।
পঞ্চদশ
সংশোধনী: দুই বিপরীত ধারণার সহাবস্থানঃ ২০১১ সালে পঞ্চদশ
সংশোধনীর মাধ্যমে ধর্মনিরপেক্ষতাকে পুনরায় সংবিধানের মৌলিক রাষ্ট্রনীতি হিসেবে ফিরিয়ে আনা হয়। ফলে
বর্তমান সংবিধানে ৮ অনুচ্ছেদে এ ধর্মনিরপেক্ষতা মৌলিক
রাষ্ট্রনীতি ব্যাখ্যা করা হয়,
১২ অনুচ্ছেদে ধর্মনিরপেক্ষতার ব্যাখ্যা করা হয় কিন্তু ২ক অনুচ্ছেদে ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম রাখা হয়। এই অবস্থানই বাংলাদেশের
সাংবিধানিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু।
সাংবিধানিক
দ্বন্দ্ব: সমালোচকদের অবস্থানঃ সমালোচকদের
মতে, ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো রাষ্ট্র কোনো
ধর্মকে বিশেষ মর্যাদা দেবে না। তাদের
মতে, ১২ অনুচ্ছেদ এবং ২ক অনুচ্ছেদ এর মধ্যে
একটি মৌলিক টানাপোড়েন রয়েছে।
যদি
রাষ্ট্র সকল ধর্মের প্রতি সমান আচরণ করে, তাহলে একটি ধর্মকে সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার যৌক্তিকতা কী? অনেক সাংবিধানিক গবেষক
মনে করেন, রাষ্ট্রধর্মের ধারণা প্রতীকী হলেও এটি সংখ্যালঘু
সম্প্রদায়ের মধ্যে রাষ্ট্রের নিরপেক্ষতা সম্পর্কে প্রশ্ন সৃষ্টি করতে পারে।
রাষ্ট্রধর্মের
সমর্থকদের যুক্তিঃ অন্যদিকে রাষ্ট্রধর্মের সমর্থকদের মতে, বাংলাদেশে মুসলমান
জনগোষ্ঠী সংখ্যাগরিষ্ঠ। তাদের মতে, রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম
বাংলাদেশের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতার
প্রতিফলন। ৪১ অনুচ্ছেদ ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করে। রাষ্ট্রধর্ম থাকা মানেই অন্য
ধর্মাবলম্বীদের অধিকার হরণ নয়। তারা
যুক্তি দেন যে যুক্তরাজ্য,
ডেনমার্কসহ অনেক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রেও
রাষ্ট্রধর্ম বা প্রতিষ্ঠিত ধর্ম
রয়েছে।
বিচার
বিভাগের দৃষ্টিভঙ্গিঃ বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে আদালতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
১.
Anwar Hossain Chowdhury v Bangladesh (41 DLR (AD) 165 (1989)- এটি বাংলাদেশের সাংবিধানিক
ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মামলা। এই মামলায় আপিল বিভাগ প্রথমবারের
মতো Basic Structure
Doctrine বা “মৌলিক কাঠামো তত্ত্ব” স্বীকৃতি দেয়।
আদালত
বলেন, Parliament
can amend the Constitution, but cannot destroy its basic structure. অর্থাৎ সংসদ সংবিধান সংশোধন
করতে পারবে, কিন্তু সংবিধানের মৌলিক বৈশিষ্ট্য ধ্বংস করতে পারবে না।
এই রায় পরবর্তীতে ধর্মনিরপেক্ষতা
নিয়ে বিতর্কে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করে।
২.
Bangladesh Italian Marble Works Ltd v Government of Bangladesh (62 DLR (AD) 298
(2010)- এটি সাধারণত “Fifth Amendment Case” নামে পরিচিত। এই মামলায় সুপ্রিম
কোর্ট পঞ্চম সংশোধনীকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করে। আদালত পর্যবেক্ষণ করেন যে ১৯৭২
সালের সংবিধানের মৌলিক আদর্শসমূহ বাংলাদেশের সাংবিধানিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। রায়ে ধর্মনিরপেক্ষতাকে সংবিধানের অন্যতম মৌলিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
৩.
State Religion Islam Case- রাষ্ট্রধর্ম
ইসলাম বাতিলের দাবিতে একাধিক রিট আবেদন করা
হয়েছিল। হাইকোর্ট পরবর্তীতে রিট খারিজ করে
এবং রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম সংক্রান্ত বিধান বহাল রাখে। আদালতের
যুক্তি ছিল, ২ক অনুচ্ছেদ অন্যান্য ধর্মের অধিকার
বাতিল করে না, ৪১ অনুচ্ছেদ ধর্মীয়
স্বাধীনতা নিশ্চিত করছে এবং রাষ্ট্রধর্মের বিধান নিজে থেকেই বৈষম্য
সৃষ্টি করছে এমনটি প্রমাণিত
হয়নি। ফলে বিচার বিভাগ
ধর্মনিরপেক্ষতা এবং রাষ্ট্রধর্ম, দুই
ধারণার মধ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান
গ্রহণ করেছে।
আন্তর্জাতিক
প্রেক্ষাপট: বাংলাদেশ কি একা? বাংলাদেশের সাংবিধানিক মডেলকে ভালোভাবে বুঝতে হলে আন্তর্জাতিক তুলনা
গুরুত্বপূর্ণ।
ফ্রান্স:
কঠোর ধর্মনিরপেক্ষতাঃ France-এ Laïcité নীতি অনুসরণ করা
হয়। রাষ্ট্র এবং ধর্মের মধ্যে
কঠোর বিচ্ছিন্নতা বজায় রাখা হয়। রাষ্ট্র
কোনো ধর্মকে বিশেষ মর্যাদা দেয় না।
ভারত:
সমদূরত্বের ধর্মনিরপেক্ষতাঃ ভারতের সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম নেই। ভারতীয় মডেলে রাষ্ট্র সকল ধর্মের প্রতি
সমান সম্মান প্রদর্শনের নীতি অনুসরণ করে।
যুক্তরাজ্য:
রাষ্ট্রধর্ম কিন্তু গণতন্ত্রওঃ United
Kingdom-এ Church of
England রাষ্ট্রের সঙ্গে সাংবিধানিকভাবে যুক্ত। তবুও দেশটি বিশ্বের
অন্যতম শক্তিশালী গণতন্ত্র এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার
উদাহরণ।
মালয়েশিয়া:
মধ্যবর্তী মডেলঃ Malaysia-এর সংবিধানে ইসলাম
ফেডারেশনের ধর্ম। কিন্তু একই সঙ্গে অন্যান্য
ধর্ম পালনের সাংবিধানিক অধিকারও স্বীকৃত। বাংলাদেশের বর্তমান মডেল অনেকাংশে মালয়েশিয়ার
সঙ্গে তুলনীয়।
অনুচ্ছেদ
৭খ এবং ভবিষ্যতের বিতর্কঃ পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ৭বি অনুচ্ছেদ যুক্ত করা হয়। এই
অনুযায়ী
সংবিধানের কিছু মৌলিক বিধান
সংশোধনযোগ্য নয়। যদি ভবিষ্যতে আদালত
ধর্মনিরপেক্ষতাকে সংবিধানের অপরিবর্তনীয় মৌলিক কাঠামোর অংশ হিসেবে আরও
দৃঢ়ভাবে ব্যাখ্যা করে, তাহলে ২ক অনুচ্ছেদ এর ভবিষ্যৎ
নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি
হতে পারে। ফলে রাষ্ট্রধর্ম ও
ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্ন এখনো চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি
হয়নি।
উপসংহারঃ
বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম এবং ধর্মনিরপেক্ষতার সহাবস্থান
একটি বিরল সাংবিধানিক বাস্তবতা।
এটি শুধু একটি আইনি
বিতর্ক নয়; বরং বাংলাদেশের
জাতীয় পরিচয়, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং সামাজিক বাস্তবতার
প্রতিফলন। বিশ্বের
অধিকাংশ রাষ্ট্র হয় ধর্মনিরপেক্ষ, নয়তো
রাষ্ট্রধর্মভিত্তিক সাংবিধানিক কাঠামো অনুসরণ করে। বাংলাদেশ সেই
দুই ধারার মাঝখানে একটি স্বতন্ত্র পথ
নির্মাণ করেছে।
তবে
প্রশ্নটি এখনও রয়ে গেছে,
রাষ্ট্র কি সকল ধর্মের
ঊর্ধ্বে অবস্থান করবে, নাকি একটি ধর্মের
সঙ্গে সাংবিধানিক সম্পর্ক বজায় রাখবে? সম্ভবত এই প্রশ্নের উত্তর
শুধু আদালত বা সংসদ নয়,
বাংলাদেশের জনগণকেই একদিন নির্ধারণ করতে হবে। আর
সে কারণেই রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম ও ধর্মনিরপেক্ষতার বিতর্ক
বাংলাদেশের সাংবিধানিক আলোচনায় আগামী দিনেও কেন্দ্রীয় বিষয় হয়ে থাকবে।
নির্বাচিত
তথ্যসূত্রঃ
1. Constitution of the People’s Republic of Bangladesh 1972,
arts 2A, 8, 12, 41 and 7B.
2. Anwar Hossain Chowdhury v Bangladesh 41 DLR (AD) 165
(1989).
3. Bangladesh Italian Marble Works Ltd v Government of
Bangladesh 62 DLR (AD) 298 (2010).
4. The Constitutional Law of Bangladesh (3rd edn, Mullick
Brothers 2012).
5. Constitutional Law of Bangladesh (3rd edn, Mullick
Brothers 2012).
লিখেছেন,
মোঃ মুসফিক হাসান নিলয়
শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, তৃতীয় বর্ষ,
ইউনিভার্সিটি অব ইনফরমেশন টেকনোলজি এন্ড সায়েন্সেস (UITS)