![]() |
| ছবি: সংগৃহীত |
ব্যক্তিগত ও সংবেদনশীল উপাত্তের সংজ্ঞা
আইনের ধারা ২(১৭) অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তিকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে শনাক্ত করা যায়—এমন তথ্য ব্যক্তিগত উপাত্ত হিসেবে বিবেচিত। এর মধ্যে নাম, পরিচয়পত্র নম্বর, ফোন নম্বর, আর্থিক তথ্য এবং অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য অন্তর্ভুক্ত। অন্যদিকে, জিনগত, বায়োমেট্রিক, স্বাস্থ্য, রাজনৈতিক বা ধর্মীয় বিশ্বাস এবং অপরাধসংক্রান্ত তথ্যের মতো বিষয় সংবেদনশীল উপাত্তের আওতায় পড়ে। এসব তথ্য ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা ও সুরক্ষা গুরুত্বপূর্ণ।
তথ্য ব্যবহারে সম্মতি ও নাগরিকের অধিকার
আইনের ধারা ৫ অনুযায়ী, ব্যক্তিগত উপাত্ত প্রক্রিয়াকরণের ক্ষেত্রে সাধারণভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সম্মতি প্রয়োজন। তবে চুক্তি বাস্তবায়ন, আইনি দাবি প্রতিষ্ঠা বা প্রতিরক্ষা এবং জীবন রক্ষার মতো নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে আইনে ব্যতিক্রম রাখা হয়েছে। সম্মতি নেওয়া হয়েছে—এটি প্রমাণের দায়িত্বও সংশ্লিষ্ট তথ্য নিয়ন্ত্রণকারীর ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে।
আইনের ধারা ১১–১৩ অনুযায়ী, ব্যক্তি নিজের ব্যক্তিগত তথ্য সম্পর্কে জানার, তথ্য সংশোধন বা হালনাগাদ করার এবং নির্দিষ্ট শর্তে সম্মতি প্রত্যাহার, আপত্তি জানানো বা তথ্য মুছে ফেলার অধিকার পাবেন। তবে আইনগত বাধ্যবাধকতা বা অন্যান্য নির্ধারিত ব্যতিক্রমের কারণে সব ক্ষেত্রে তথ্য মুছে ফেলার অধিকার প্রযোজ্য নাও হতে পারে।
তথ্য নিয়ন্ত্রণকারীর দায়িত্ব ও নিরাপত্তা
আইনের ধারা ১৫–২০ অনুযায়ী, তথ্য নিয়ন্ত্রণকারী ও প্রক্রিয়াকরণকারীদের তথ্য সংগ্রহ ও ব্যবহারের উদ্দেশ্য স্পষ্ট করা, তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত সময় তা সংরক্ষণ না করার দায়িত্ব রয়েছে। উপাত্ত প্রক্রিয়াকরণের রেকর্ড অন্তত পাঁচ বছর সংরক্ষণের বিধানও রয়েছে। তথ্য ফাঁস বা নিরাপত্তা লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটলে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
শিশুদের ব্যক্তিগত উপাত্তের ক্ষেত্রেও বিশেষ সুরক্ষার বিধান রাখা হয়েছে। আইনের ধারা ৯ অনুযায়ী, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে শিশুদের তথ্য প্রক্রিয়াকরণের জন্য পিতা-মাতা বা আইনগত অভিভাবকের সম্মতির বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
বিদেশে তথ্য স্থানান্তর ও সংবেদনশীল তথ্যের সুরক্ষা
আইনের ধারা ২৯-এ ব্যক্তিগত উপাত্তের শ্রেণিবিন্যাস ও স্থানান্তরসংক্রান্ত বিধান রয়েছে। তথ্যের ধরন অনুযায়ী উন্মুক্ত, অভ্যন্তরীণ, গোপনীয় ও সীমাবদ্ধ শ্রেণিবিন্যাসের কথা বলা হয়েছে। বিদেশে তথ্য স্থানান্তরের ক্ষেত্রে সম্মতি, চুক্তি এবং প্রয়োজনীয় কারিগরি অবকাঠামোর মতো বিষয় প্রাসঙ্গিক হতে পারে। বিপুল পরিমাণ উপাত্ত স্থানান্তরের ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষকে অবহিত করার বিধানও রয়েছে।
আইন লঙ্ঘনে জরিমানা ও ক্ষতিপূরণ
আইনের ধারা ৩২ অনুযায়ী, তথ্যের অধিকার লঙ্ঘনের নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা প্রশাসনিক জরিমানার বিধান রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিয়ন্ত্রণকারীর ক্ষেত্রে নির্ধারিত পরিস্থিতিতে জরিমানার পরিমাণ সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা হতে পারে। ধারা ৩৩-এ তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থতার জন্য সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া ধারা ৩৫ অনুযায়ী, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে প্রশাসনিক জরিমানার পাশাপাশি ক্ষতিপূরণ দাবি করার সুযোগ রয়েছে। লঙ্ঘনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পরিচালক, ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা কর্মচারীর দায়ের বিষয়টিও ধারা ৩৬-এ বিবেচনা করা হয়েছে। ধারা ৩৭ অনুযায়ী, নির্ধারিত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ৩০ দিনের মধ্যে আপিলের বিধান রয়েছে।
কার্যকারিতা ও বাস্তবায়নের প্রশ্ন
আইনের ধারা ১(৩) অনুযায়ী, ধারা ২৩ এবং ধারা ৩১–৩৫ ছাড়া অন্যান্য বিধান ৬ নভেম্বর ২০২৫ থেকে কার্যকর বলে গণ্য হবে। ব্যতিক্রমী ধারাগুলো আইন প্রণয়নের পর ১৮ মাস অতিক্রান্ত হলে সরকারের গেজেট প্রজ্ঞাপনে নির্ধারিত তারিখে কার্যকর হওয়ার কথা। ফলে এসব ধারার কার্যকর হওয়ার নির্দিষ্ট তারিখ জানতে সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রজ্ঞাপন যাচাই করা প্রয়োজন।
পর্যালোচনা
ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা আইন নাগরিকের গোপনীয়তা রক্ষা, তথ্য ব্যবহারে স্বচ্ছতা এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি কাঠামো তৈরি করেছে। তবে আইনের বাস্তব সাফল্য নির্ভর করবে এর কার্যকর প্রয়োগ, তথ্য সুরক্ষায় প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, যথাযথ তদারকি এবং নাগরিকদের অধিকার সম্পর্কে সচেতনতার ওপর। একই সঙ্গে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা ও বৈধ প্রয়োজনে তথ্য ব্যবহারের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাও হবে বাস্তবায়নের অন্যতম চ্যালেঞ্জ।
বিড ল' পোস্ট/মাসুম