
ছবি: সংগৃহীত
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশ জাতীয় সংসদে বাতিল হওয়ায় এক খোলা চিঠি দিয়েছেন ‘সদ্য বিদায়ী’ কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্যরা।
চিঠিতে তারা অধ্যাদেশ বাতিলের সপক্ষে সংসদে উপস্থাপিত তথ্যের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তবে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান তাদের এই বক্তব্যকে ‘সম্পূর্ণ ভুল ব্যাখ্যা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
সোমবার গণমাধ্যমে পাঠানো ওই চিঠিতে সই করেছেন কমিশনের চেয়ারম্যান বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীসহ পাঁচ সদস্য। সেখানে তারা নিজেদের ‘সদ্য বিদায়ী’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তাদের মতে, ২০২৫ সালের অধ্যাদেশটি রহিত হওয়ায় তাদের নিয়োগই কার্যত বাতিল হয়ে গেছে।
খোলা চিঠিতে কমিশনের অবস্থানখোলা চিঠিতে বিদায়ী কমিশনাররা ‘সংসদে উপস্থাপিত ভুল তথ্যের জবাব’, ‘সরকারের প্রকৃত আপত্তি’ ও ‘ভবিষ্যৎ আইনের গুণগত মান’ শিরোনামে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেন।
তারা বলেন, সংসদে বলা হয়েছে গুমের সাজা মাত্র ১০ বছর, যা ভুক্তভোগীদের জন্য অবিচার। কিন্তু বাস্তবে ওই অধ্যাদেশে অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ড ও যাবজ্জীবনের বিধানও ছিল।
তদন্তের সময়সীমা ও জরিমানা আদায়ের পদ্ধতি নেই বলে সংসদে যে দাবি করা হয়েছে, তাও নাকচ করেছেন কমিশনাররা। তাদের মতে, ২০২৫ সালের অধ্যাদেশে এসব বিষয় স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল, যা বর্তমানের পুনর্বহালকৃত ২০০৯ সালের আইনে নেই। চিঠিতে আরও বলা হয়, অধ্যাদেশ বাতিলের ফলে নতুন কোনো গুমের ঘটনা ঘটলে ভুক্তভোগীরা কার্যকর প্রতিকার পাবেন না।
কমিশন সদস্যরা অভিযোগ করেন, সরকার কমিশনকে শক্তিশালী করার কথা বললেও মূলত কমিশনের স্বাধীনতা খর্ব করে একে মন্ত্রণালয়ের অধীনে রাখার চেষ্টা করছে। বিশেষ করে নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে তদন্তে সরকারের পূর্বানুমতির শর্ত আরোপের সমালোচনা করেন তারা।
অধ্যাদেশ রহিত হওয়ার পর থেকেই পদত্যাগ ও স্বপদে থাকা নিয়ে আইনি জটিলতা তৈরি হয়েছে।
কমিশনের সদস্য নূর খান বলেন, “যে মুহূর্তে বিলটি রহিত করা হয়েছে, সেই মুহূর্ত থেকে এই পদে বহাল থাকার আর কোনো সুযোগ নেই। আমরা একটা জটিল জায়গায় আটকে গেছি।” কমিশন সচিব কুদরত-এ-ইলাহী জানান, আইন পাসের পর থেকে চেয়ারম্যান ও সদস্যরা আর অফিসে আসছেন না।
‘ভুল ব্যাখ্যা’ বলছেন আইনমন্ত্রীকমিশনারদের এই খোলা চিঠির বিষয়ে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান গণমাধ্যমে বলেন, “তারা যা বলেছেন, তা সম্পূর্ণ ভুল ব্যাখ্যা। আপনি যদি আইনটি দেখেন, সেখানে স্পষ্টভাবে বলা আছে, শাস্তি হতে পারে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ১০ বছর। সর্বোচ্চ ১০ বছর মানে আদালতের এখতিয়ার আছে এই সীমার মধ্যে যেকোনো সময়ের শাস্তি দেওয়ার।”
তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময়সীমা নিয়ে কমিশনারদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে মন্ত্রী বলেন, “একটি নির্দিষ্ট সময়ে প্রতিবেদন জমার কথা থাকলেও সেটি পাওয়ার পর সিদ্ধান্ত নিতে কত সময় লাগবে, সে বিষয়ে কোনো নির্দেশনা ওই অধ্যাদেশে ছিল না।”
আসাদুজ্জামান মনে করেন, কমিশনাররা ভুল ধারণার ওপর ভিত্তি করে এসব কথা বলছেন, তাই এর কোনো লিখিত জবাব দেওয়ার প্রয়োজন নেই। ২০২৫ সালের অক্টোবরে অন্তর্বর্তী সরকার নতুন অধ্যাদেশ জারি করে এবং ফেব্রুয়ারিতে বর্তমান কমিশন নিয়োগ দেয়। তবে গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে কণ্ঠভোটে ওই অধ্যাদেশটি রহিত করে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন ২০০৯’ পুনঃপ্রচলন করা হয়।
সরকার জানিয়েছে, অধ্যাদেশের দুর্বলতা দূর করতে এবং অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে আরও শক্তিশালী আইন করার লক্ষ্যেই সাময়িকভাবে ২০০৯ সালের আইনে ফিরে যাওয়া হয়েছে। মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে এ বিষয়ে পরামর্শ সভা আয়োজন করা হতে পারে।